ভোট ঘোষণা হতেই প্রশাসনে বড় রদবদল, কমিশনের কড়া পদক্ষেপ

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
কলকাতা : বাংলার রাজনীতিতে বড়সড় মোড়। বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক স্তরে বড়সড় রদবদল করল নির্বাচন কমিশন। মুখ্যসচিব থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রসচিব, এমনকি পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ পদেও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপকে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে প্রশাসনিক অন্দরে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। রবিবারই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বাংলা সহ দেশের পাঁচটি রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করে। সেই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই সারা রাজ্যে কার্যকর হয়ে যায় নির্বাচনী আচরণ বিধি বা মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট। এই বিধি চালু হওয়ার পর প্রশাসনিক অনেক ক্ষমতাই সরাসরি নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। বিশেষ করে আইন-শৃঙ্খলা এবং নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত বিষয়ের উপর নজরদারি থাকে কমিশনের। এই পরিস্থিতিতেই বাংলার প্রশাসনে বড় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের মুখ্যসচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে নন্দিনী চক্রবর্তীকে। পাশাপাশি পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব জগদীশপ্রসাদ মীনাকেও। কমিশনের তরফে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভোট প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কেউই নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে যুক্ত থাকতে পারবেন না। প্রশাসনিক মহলের অনেকেই মনে করছেন, নির্বাচনকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ রাখার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কারণ, নির্বাচনের সময় রাজ্যের শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের সিদ্ধান্ত অনেক সময় সরাসরি ভোটের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কমিশন প্রায়শই এ ধরনের বদলির সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মুখ্যসচিবের পদে নতুন করে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দুষ্মন্ত নারিয়ালাকে। এর আগে তিনি বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর এবং কারা দফতরের অতিরিক্ত দায়িত্বও সামলাচ্ছিলেন তিনি। দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী সোমবার দুপুর তিনটার মধ্যে তাঁকে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে রাজ্যের নতুন স্বরাষ্ট্রসচিব হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে সঙ্ঘ্মিত্রা ঘোষকে। তিনি এর আগে হোম অ্যান্ড হিল অ্যাফেয়ার্স দফতরের সচিব ছিলেন। প্রশাসনিক মহলে তিনি একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ আধিকারিক হিসেবে পরিচিত। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনিও সোমবার দুপুর তিনটার মধ্যেই নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
ভোট ঘোষণা হতেই প্রশাসনে বড় রদবদল, কমিশনের কড়া পদক্ষেপ
নির্বাচনের আগে বড় পদক্ষেপ কমিশনের
এদিকে শুধুমাত্র প্রশাসনিক স্তরেই নয়, পুলিশ প্রশাসনেও বড়সড় রদবদলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি বা ডিরেক্টর জেনারেলের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে পীযূষ পান্ডেকে। তাঁর জায়গায় নতুন ডিজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে সিদ্ধনাথ গুপ্তাকে। পুলিশ প্রশাসনের এই পরিবর্তনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে। কারণ নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কমিশন চায় এমন একজন আধিকারিক এই দায়িত্বে থাকুন, যাঁর প্রতি সব পক্ষের আস্থা রয়েছে। শুধু রাজ্য পুলিশের শীর্ষ পদেই নয়, কলকাতা পুলিশেও বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। কলকাতার পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে সুপ্রতীম সরকারকে। তাঁর জায়গায় নতুন পুলিশ কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অজয় কুমার নন্দাকে। এছাড়াও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন করা হয়েছে। নটরাজন রমেশ বাবুকে নতুন ডিজি কারেকশনাল সার্ভিস হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অজয় রানাডেকে করা হয়েছে এডিজি ল অ্যান্ড অর্ডার। নির্বাচন কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, এই সমস্ত পরিবর্তন সোমবার বিকেল তিনটার মধ্যেই কার্যকর করতে হবে। কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী যাঁদের পদ থেকে সরানো হয়েছে, তাঁরা কেউই নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও কাজে যুক্ত থাকতে পারবেন না। এই নির্দেশ কঠোরভাবে মেনে চলার জন্যও বলা হয়েছে রাজ্য প্রশাসনকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার নির্বাচন সবসময়ই অত্যন্ত স্পর্শকাতর। অতীতে বহুবার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা এবং সংঘর্ষের ঘটনা সামনে এসেছে। তাই এবার শুরু থেকেই কঠোর অবস্থান নিতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। প্রশাসন এবং পুলিশ—দুই ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এই বড়সড় রদবদল করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের পর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া। বিরোধী দলগুলি অনেকদিন ধরেই প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার দাবি জানিয়ে আসছিল। অন্যদিকে শাসকদলের তরফে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে তারা সম্মান জানায়। সব মিলিয়ে বাংলার বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক স্তরে এই বড়সড় পরিবর্তন নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপ রাজ্যের ভোট প্রক্রিয়াকে কতটা শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ করে তুলতে পারে। বাংলার ভোটের লড়াই ইতিমধ্যেই জমে উঠেছে। রাজনৈতিক দলগুলিও জোরকদমে প্রচারে নেমে পড়েছে। তার মাঝেই প্রশাসনের এই বড় রদবদল নিঃসন্দেহে নির্বাচনের পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করল।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram