নেপালে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার কন্যার সাফল্য

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
হুগলি : আন্তর্জাতিক মঞ্চে আবারও উজ্জ্বল হল বাংলার নাম। নেপালে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিক স্কুল গেমসে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করে জেলার পাশাপাশি গোটা রাজ্যের মুখ উজ্জ্বল করলেন হুগলির ত্রিবেণী বৈকুণ্ঠপুরের বাসিন্দা স্নেহা হালদার। দীর্ঘ এক দশকের কঠোর অনুশীলন, একাধিক সাফল্য এবং চোট-আঘাতকে জয় করে এবার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জোড়া পদক জিতে নতুন ইতিহাস গড়লেন তিনি। স্নেহার এই সাফল্যে খুশির আবহ গোটা পরিবারে। বাড়িতে ফিরতেই মিষ্টিমুখ করিয়ে শুভেচ্ছায় ভরিয়ে দেন পরিবারের সদস্যরা। সম্প্রতি নেপালের দাং জেলার তুলসিপুরে একটি সরকারি প্রেক্ষাগৃহে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় প্রথম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল গেমস। এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে মোট পাঁচটি দেশ— ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কা। ছেলে ও মেয়ে উভয় বিভাগের বিভিন্ন ইভেন্টে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অংশগ্রহণকারী প্রতিযোগীদের মধ্যে উত্তরপ্রদেশের তিনজন খেলোয়াড়ও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেন। ছেলেদের বিভাগে সেহেরে আলাম কুমিতে প্রথম স্থান, সৌরভ বাল্মিকী দ্বিতীয় স্থান এবং জান মহম্মদ তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। অন্যদিকে, মেয়েদের বিভাগে ভারতের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে জোড়া পদক জয় করেন হুগলির ত্রিবেণী বৈকুণ্ঠপুরের কন্যা স্নেহা হালদার। তাঁর এই সাফল্যে গর্বিত গোটা বাংলা। বর্তমানে স্নেহা মাস্টার্স ডিগ্রির পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্রও অনেক বিস্তৃত। ক্যারাটের পাশাপাশি তিনি আঁকা, নাচ এবং মেহেন্দি শেখাতেও ভালোবাসেন। ছোটবেলা থেকেই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী স্নেহা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। প্রায় দশ বছর আগে ত্রিবেণী টাউনশিপ থেকেই তাঁর ক্যারাটে জীবনের সূচনা। পরে আরও উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য তিনি নদীয়া জেলার কল্যাণীতে অনুশীলন শুরু করেন। ধীরে ধীরে কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা এবং অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে একজন সফল ক্যারাটে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তোলেন। স্নেহার পুরস্কারের ঝুলিও বেশ সমৃদ্ধ। জেলা, রাজ্য এবং জাতীয় স্তরে একাধিক প্রতিযোগিতায় তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে পদক জয় করেছেন। শুধু খেলাধুলাতেই নয়, অঙ্কন এবং নাচেও একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
নেপালে আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলার কন্যার সাফল্য
দেড় বছরের চোট-যন্ত্রণা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সাফল্যের হাসি স্নেহা হালদারের

২০১৯ সালে ত্রিবেণীতে অনুষ্ঠিত রাজ্য ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন স্নেহা। এরপর ২০২১ সালে খামারগাছিতে আয়োজিত রাজ্য প্রতিযোগিতায় কুমিতে এবং কাতা বিভাগে তৃতীয় স্থান লাভ করেন। ২০২২ সালেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন তিনি। বুদবুদে অনুষ্ঠিত রাজ্য প্রতিযোগিতায় কুমিতে এবং কাতা বিভাগে তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। একই বছরে আরামবাগে জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় কাতা বিভাগে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। নৈহাটিতে আন্তঃজেলা প্রতিযোগিতায় কুমিতে দ্বিতীয় স্থান এবং কল্যাণীতে রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতাতেও দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০২৩ সালে আরামবাগে জেলা স্তরের প্রতিযোগিতায় কুমিতে প্রথম স্থান অর্জন করে আরও একবার নিজের দক্ষতার প্রমাণ দেন স্নেহা। কিন্তু সেই বছরই খেলতে গিয়ে গুরুতর চোট পান তিনি। প্রায় দেড় বছর অসুস্থ থাকার কারণে খেলার মাঠ থেকে দূরে থাকতে হয় তাঁকে। তবে হার মানেননি স্নেহা। সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে নতুন করে ফিরে আসেন তিনি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে হিমাচল প্রদেশে অনুষ্ঠিত অল ইন্ডিয়া ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে অঙ্কুর অস্ত্র ট্রফি জয় করেন। এরপর ২০২৫ সালে লিলুয়ায় অনুষ্ঠিত খেলো ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতায় কাতা বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। একই বছর বাঘনাপাড়ায় অনুষ্ঠিত রাজ্য ক্যারাটে প্রতিযোগিতায় কুমিতে এবং কাতা— দুই বিভাগেই প্রথম স্থান অর্জন করেন। এরপর চলতি বছরের এপ্রিল মাসে ঝাড়খণ্ডে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান গেমসে কাতা এবং কুমিতে উভয় বিভাগেই প্রথম স্থান অধিকার করে নজর কাড়েন স্নেহা। আর এবার জুন মাসে নেপালে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক লুম্বিনী কাপে প্রথম এবং তৃতীয় স্থান অর্জন করে আন্তর্জাতিক স্তরেও নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখলেন তিনি। মেয়ের এই সাফল্যে অত্যন্ত খুশি স্নেহার বাবা-মা ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছোটবেলা থেকেই স্নেহা অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং লক্ষ্যপূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরিবারের সদস্যদের কথায়, কখন যে সে কীভাবে এত কিছু সামলে নেয়, তা অনেক সময় তাঁরাও বুঝে উঠতে পারেন না। স্নেহার কাকিমা জানান, খেলাধুলার পাশাপাশি পরিবারের প্রতিও যথেষ্ট দায়িত্বশীল স্নেহা। মাংস এবং ফাস্টফুড খেতে খুবই ভালোবাসে সে। সময় পেলেই রান্নাঘরে ঢুকে নিজের হাতে নানা পদ রান্না করে পরিবারের সদস্যদের খাওয়ায়, আবার নিজেও আনন্দ করে খায়। স্নেহার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তাঁর এই আন্তর্জাতিক সাফল্যে আনন্দে আত্মহারা পরিবারের সদস্যরা। কেউ মিষ্টি খাইয়ে দিচ্ছেন, কেউ আবার শুভেচ্ছা জানিয়ে উৎসাহ বাড়িয়ে দিচ্ছেন। গোটা পরিবারই গর্বিত তাঁদের মেয়ের এই অসাধারণ সাফল্যে। দীর্ঘ সংগ্রাম, কঠোর অনুশীলন এবং অদম্য মানসিক শক্তির জোরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছেন হুগলির কন্যা স্নেহা হালদার। আগামী দিনে আরও বড় সাফল্য অর্জন করে দেশের জন্য আরও অনেক সম্মান বয়ে আনবেন, এমনটাই আশা পরিবারের পাশাপাশি এলাকার মানুষেরও।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram