বক্রেশ্বরে শিবের মাথায় জল ঢালতে চালু 'চোঙা সিস্টেম' !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
বীরভূম : ভোর না হতেই বীরভূমের বক্রেশ্বর শিব মন্দির চত্বরে শুরু হয়ে যায় ভক্তদের ভিড়। চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে “হর হর মহাদেব”, “বোল বাম” ধ্বনিতে। কাঁধে বাঁক, হাতে গঙ্গাজলের কলসি নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার পুণ্যার্থী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন বাবা বক্রনাথের উদ্দেশে জল নিবেদনের জন্য। প্রতি বছরের মতো এবারও শ্রাবণ মাসের প্রথম সোমবারে বিপুল ভিড়ের সাক্ষী থাকল বক্রেশ্বর। তবে এবারের আয়োজন ছিল কিছুটা আলাদা। মন্দিরের ইতিহাসে প্রথমবার চালু হয়েছে ‘চোঙা সিস্টেম’, যার মাধ্যমে ভক্তরা গর্ভগৃহে প্রবেশ না করেই মহাদেবের শিবলিঙ্গে জল নিবেদন করতে পারছেন। মন্দির কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে এবার সাধারণ ভক্তদের গর্ভগৃহে প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। মন্দিরের বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে বিশেষ ধাতব চোঙা বা পাইপের মতো একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভক্তরা সেই চোঙার মধ্যে গঙ্গাজল ঢালছেন, আর সেই জল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে বাবা বক্রনাথের শিবলিঙ্গে। এই নতুন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে শুরুতে অনেকের মধ্যেই কৌতূহল ছিল। তবে জল নিবেদনের পর অধিকাংশ ভক্তই জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে মূল বিষয় হল ভক্তি ও বিশ্বাস। মহাদেবের উদ্দেশে আন্তরিকভাবে জল অর্পণ করতে পারলেই তাঁরা সন্তুষ্ট। বক্রেশ্বর শিব মন্দির পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন এবং বিখ্যাত শৈব তীর্থক্ষেত্র। পাপহরা নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দির ৫১ সতীপীঠের অন্যতম বলেও পরিচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী সতীর ভ্রূমধ্য বা কপালের অংশ এখানে পতিত হয়েছিল। সেই থেকেই এই স্থান হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র তীর্থ হিসেবে বিবেচিত।
বক্রেশ্বরে শিবের মাথায় জল ঢালতে চালু 'চোঙা সিস্টেম' !
ভক্তদের নিরাপত্তায় বক্রেশ্বরে নতুন নিয়ম, গর্ভগৃহে প্রবেশ বন্ধ, প্রথমবার চালু ‘চোঙা সিস্টেম’

শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও শ্রাবণ মাসে হাজার হাজার ভক্ত বক্রেশ্বরে আসেন। বিশেষ করে শ্রাবণের প্রতিটি সোমবারে ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ফলে গর্ভগৃহের সামনে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা, ধাক্কাধাক্কি এবং নিরাপত্তাজনিত নানা সমস্যা তৈরি হতো। এই পরিস্থিতি এড়াতেই এবার যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়েছে মন্দির উন্নয়ন কমিটি, সেবায়েত সংগঠন এবং জেলা প্রশাসন। তাঁদের সিদ্ধান্তেই চালু করা হয়েছে ‘চোঙা সিস্টেম’। পুলিশ প্রশাসনের দাবি, এই ব্যবস্থার ফলে একদিকে যেমন গর্ভগৃহে অতিরিক্ত ভিড় কমবে, তেমনি দুর্ঘটনার আশঙ্কাও অনেকটাই হ্রাস পাবে। প্রবীণ, মহিলা ও শিশুদের জন্যও জল নিবেদন অনেক সহজ হবে। মন্দির চত্বরে নিরাপত্তা জোরদার করতে মোতায়েন করা হয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও সিভিক ভলান্টিয়ার। রয়েছে ব্যারিকেড, আলাদা প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, সিসিটিভি নজরদারি এবং মাইকিংয়ের মাধ্যমে নিয়মিত ঘোষণা। ভিড় নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন স্বেচ্ছাসেবকরাও। প্রশাসনের দাবি, দেশের একাধিক বিখ্যাত শিবমন্দিরে বহুদিন ধরেই এই ধরনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে। বিশেষ করে শ্রাবণ মাসে ভক্তদের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে এই পদ্ধতি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখেই এবার প্রথমবারের মতো বক্রেশ্বরেও চালু করা হয়েছে এই ব্যবস্থা। মন্দিরে আসা বহু ভক্ত জানিয়েছেন, প্রথমে কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও পরে তাঁরা বুঝতে পেরেছেন যে এই সিদ্ধান্ত মূলত নিরাপত্তার জন্যই নেওয়া হয়েছে। ভিড়ের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা বা ধাক্কাধাক্কি ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে জল নিবেদন করতে পেরে তাঁরা খুশি। এদিকে মন্দির চত্বরে ধর্মীয় আবহের পাশাপাশি উৎসবের আমেজও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফুল, বেলপাতা, ধূপ, প্রসাদ ও পূজার সামগ্রীর দোকানে সকাল থেকেই ছিল উপচে পড়া ভিড়। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার উদ্যোগে ভক্তদের জন্য পানীয় জল, শরবত এবং প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়। দিনভর প্রশাসনের নজরদারিতে নির্বিঘ্নে চলে জল নিবেদন এবং পুজো। কোনও অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতেও এই ব্যবস্থা চালু রাখা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ধর্মীয় ঐতিহ্য বজায় রেখেই আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভক্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগকে অনেকেই সময়োপযোগী বলে মনে করছেন। শ্রাবণের প্রথম সোমবারে বক্রেশ্বরে ‘চোঙা সিস্টেম’-এর সফল প্রয়োগ সেই বার্তাই তুলে ধরল।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram