নিরাপত্তায় কাটছাঁট অনুব্রতর

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
বীরভূম : একসময় বীরভূম মানেই ছিল অনুব্রত মণ্ডলের দাপট। জেলার রাজনীতি থেকে প্রশাসন— সর্বত্রই ছিল তাঁর প্রভাব। রাজনৈতিক মহলে এমন কথাও প্রচলিত ছিল যে, তাঁর কথাতেই নাকি “বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খায়”। রাজ্যের ক্ষমতায় তৃণমূল কংগ্রেস থাকাকালীন সময় অনুব্রত মণ্ডলের প্রতাপ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু সময় বদলেছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এবার সেই অনুব্রত মণ্ডলের নিরাপত্তা নিয়েই বড় সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য প্রশাসন। ওয়াই প্লাস ক্যাটাগরির নিরাপত্তা সরিয়ে নেওয়া হল বীরভূমের এই প্রভাবশালী নেতার। প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে, রাজ্যের তরফেই এই নিরাপত্তা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতদিন অনুব্রত মণ্ডলের বাড়ির সামনে নিয়মিত মোতায়েন থাকতেন পুলিশ কর্মীরা। তাঁর নীচুপট্টির বাড়ির আশপাশে কড়া নিরাপত্তা বলয় চোখে পড়ত। কিন্তু এবার সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। ধীরে ধীরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে নিরাপত্তারক্ষীদের। রাজনৈতিক মহলে এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। রাজ্যে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক হেভিওয়েট নেতার অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বীরভূম জেলা দীর্ঘদিন ধরেই অনুব্রত মণ্ডলের গড় হিসেবে পরিচিত ছিল। সংগঠনের ভিত মজবুত করা থেকে শুরু করে নির্বাচনী লড়াই— সব ক্ষেত্রেই অনুব্রতর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর অনুগামীদের সংখ্যাও কম ছিল না। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর জেলার রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। এবারের নির্বাচনে বীরভূম জেলায় বিজেপি ৬টি আসনে জয় পেয়েছে। যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে বিরোধী দলের এই উত্থান অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ফল প্রকাশের পর থেকেই জেলার তৃণমূলের ছোট-বড় বহু নেতাকেই প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা দলীয় জমায়েতেও আগের সেই ভিড় আর চোখে পড়ছে না। এই পরিস্থিতির মধ্যেই অনুব্রত মণ্ডলকে নিয়েও তৈরি হয়েছে জল্পনা। স্থানীয় সূত্রে খবর, ফল প্রকাশের পর থেকে তিনি খুব একটা বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন না। নীচুপট্টির বাড়িতেই অধিকাংশ সময় কাটাচ্ছেন। একসময় তাঁর বাড়ির সামনে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের ভিড় লেগেই থাকত। কেষ্ট অনুগামীদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এখন সেই ছবিও অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বাড়ির সামনে আগের মতো রাজনৈতিক কর্মীদের ভিড় আর দেখা যাচ্ছে না বলেই দাবি স্থানীয়দের একাংশের।
নিরাপত্তায় কাটছাঁট অনুব্রতর
রাজ্য বদল, কমল অনুব্রতর নিরাপত্তা

তবে এতদিন পর্যন্ত অন্তত পুলিশি নিরাপত্তা চোখে পড়ছিল। বাড়ির আশপাশে মোতায়েন থাকতেন পুলিশ কর্মীরা। কিন্তু এবার সেই নিরাপত্তাও তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা উঠে আসছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি শুধুমাত্র প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। আবার বিরোধীদের একাংশের দাবি, রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলের পর প্রভাবশালী নেতাদের গুরুত্বও কমতে শুরু করেছে। অনুব্রত মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই রাজ্য রাজনীতির অত্যন্ত আলোচিত মুখ। তাঁর বিভিন্ন মন্তব্য ও রাজনৈতিক কার্যকলাপ বহুবার শিরোনামে এসেছে। সমর্থকদের কাছে তিনি যেমন ছিলেন শক্তিশালী সংগঠক, তেমনই বিরোধীদের কাছে ছিলেন বিতর্কিত রাজনৈতিক চরিত্র। ফলে তাঁর নিরাপত্তা প্রত্যাহারের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কোনো নেতার নিরাপত্তা কমানো বা তুলে নেওয়া শুধুমাত্র প্রশাসনিক বিষয় নয়, অনেক সময় তা রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘদিন ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই জল্পনা তৈরি হয়। অনুব্রত মণ্ডলের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি সামনে আসেনি। কেন নিরাপত্তা প্রত্যাহার করা হল, নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। অনুব্রত মণ্ডল নিজেও এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি। অন্যদিকে, বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের দাবি, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলিও বদলাচ্ছে। তাঁদের মতে, একসময় যাঁদের ঘিরে কড়া নিরাপত্তা থাকত, এখন তাঁদের প্রভাব অনেকটাই কমে গিয়েছে। যদিও তৃণমূলের একাংশ এখনও দাবি করছে, অনুব্রত মণ্ডল সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন এবং রয়েছেন। নিরাপত্তা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা না দেওয়ারও আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে, বীরভূমের রাজনীতিতে অনুব্রত মণ্ডলের নিরাপত্তা প্রত্যাহারের ঘটনা নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। একসময় যাঁর বাড়ির সামনে ছিল কড়া পুলিশি পাহারা, রাজনৈতিক কর্মীদের ভিড় এবং ক্ষমতার প্রভাব— আজ সেই ছবিতে বদলের ইঙ্গিত স্পষ্ট। রাজ্যের পালাবদলের পর রাজনৈতিক বাস্তবতাও যে দ্রুত বদলাচ্ছে, অনুব্রত মণ্ডলের নিরাপত্তা প্রত্যাহারের ঘটনাকে ঘিরে সেই বার্তাই যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram