আঁধারের ঘেরাটোপে জীবন !! শবরদের কাছে এসআইআর এক গোলকধাঁধা !!

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
বাঁকুড়া : দেশের স্বাধীনতার বয়স ছুঁয়েছে প্রায় ৮০ বছর। এই সুদীর্ঘ সময়ের মধ্যে বিজ্ঞান, ও প্রযুক্তি থেকে শুরু করে সামগ্রিকভাবে উন্নয়নের এভারেস্টে পৌঁছেছে তৃতীয় বিশ্বের দেশ ‘ভারত’। তবে উন্নয়নের গালভরা কথা, আজও এ জনপদে এক সুদূর দিগন্তের স্বপ্নে মোড়ানো মায়াবী চিত্র। উন্নয়ন না থাকলেও এ জনপদে আছে খিদে,আছে অনাহার, চাপ চাপ দারিদ্র্য, অশিক্ষা আর অনেকখানি হতাশার পুরু চাদরে মোড়া বঞ্চনার বারোমাস্যা। আর আছে প্রতি বছর কোন না কোন ভোট। আছে রাজনৈতিক দলের আস্ফালন! আছে প্রতিশ্রুতি, আছে রাজনৈতিক স্লোগান, আছে রামরাজত্বের অলীক হাতছানি! আছে সস্তা,বিনে পয়সার রেশনের হাততালি কুড়োনোর প্রতিযোগিতার কাহিনী। আদিবাসী অধ্যুষিত এই জনপদে আছে এসআইআর- এর চোখ রাঙানি। আছে কোন এক অদৃশ্য হাত দিয়ে অশিক্ষা, দারিদ্র্যের অন্ধকারে থাকা মানুষগুলোর নাগরিকত্ব মুছে দেওয়ার হাড়হিম হুমকি! না, আন্দামান বা নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কোন নাম না জানা জারোয়া দ্বীপের অলীক গল্প এটা নয়। এ বাংলারই অনুন্নয়নের কালো অন্ধকারে মুখ ঢেকে থাকা বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহল এলাকা। জঙ্গলমহলের ঘন জঙ্গলের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আদিবাসী শবর সম্প্রদায়ের রানিবাঁধ ব্লকের কয়েকটি গ্রাম। উন্নয়নের আলো যেখানে আজও অধরা, সেই গ্রামগুলিতে হঠাৎ হাজির হয়েছে এসআইআর ফর্ম। আর সেই কাগজটিই এখন শবর সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনে হানা দেওয়া নতুন আতঙ্ক,এক মহা উপদ্রব। লেখাপড়া না জানা গ্রামবাসীরা বুঝতেই পারছেন না, এই ফর্মে কী লিখবেন, ভুল হলে কী হারাবেন! প্রশাসনের প্রকল্প নয়, আতঙ্কই যেন পৌঁছে গেছে সবার মনের অন্দরে। দক্ষিণ বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের রানিবাঁধ ব্লকে রয়েছে বেশ কয়েকটি শবর গ্রাম। ঘাগরা, মৌলা, বড়ডাঙ্গা ইত্যাদি শবর অধ্যুষিত গ্রামে সব মিলিয়ে প্রায় ৭০টি শবর পরিবারের বসবাস। Weathered hut with tarp roof and hanging items. স্বাধীনতার ৭৮ বছর পার হলেও আজও উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছায়নি এই গ্রামগুলিতে। আবাস প্রকল্পে কারও ঘর হয়নি, নেই পাকা রাস্তা, পানীয় জলেরও অভাব। দুর্গম পথ পেরিয়েই পৌঁছাতে হয় গ্রামগুলিতে। গ্রামের অধিকাংশ‌ই স্কুলের মুখ দেখেননি,আট থেকে আশি,নারী পুরুষ সবাই অক্ষর পরিচয়হীন।এরই মধ্যে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে গেছে এসআইআর কর্মসূচির এনিউমারেশন ফর্ম। ব্লক প্রশাসনের নির্দেশে বিএলও-রা গিয়ে শবর পরিবারগুলির হাতে এনিউমারেশন ফর্ম তুলে দিয়েছেন। কিন্তু সেই ফর্ম কীভাবে পূরণ করবেন তাঁরা! কোথায় জমা দিতে হবে সেই নথি ! কোন্ কোন্ নথি লাগবে, সেসব কিছুই জানেন না নিরন্ন, নিরক্ষর গ্রামের মানুষগুলো। ফলে বিভ্রান্তি আর আতঙ্কে দিন কাটছে তাঁদের। গ্রামের প্রবীণরা বলছেন, আমরা তো লেখাপড়া জানি না। কাগজে কী লিখতে হবে, কে জানাবে? অনেকে আবার আশঙ্কা করছেন, ভুল করলে সরকারি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে না তো? দেশের অন্যতম পিছিয়ে পড়া জনজাতি শবর সম্প্রদায় একসময় সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সরকারি উদ্যোগে তাঁদের মূল ধারায় ফেরানোর চেষ্টা হলেও ঘাগরার মতো গ্রামগুলিতে সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। উন্নয়নের আলো না পৌঁছালেও কাগজে-কলমে প্রশাসনের নতুন নতুন প্রকল্প পৌঁছে যাচ্ছে তাঁদের দরজায়। কিন্তু বাস্তবে সেই ফর্মই যেন আজ আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠেছে শবর গ্রামগুলিতে। এবিষয়ে তৃণমূলের রানিবাঁধ ব্লক সভাপতি উত্তম কুম্ভকার বলেন, এলাকায় শিক্ষার হার অত্যন্ত কম। বহু মানুষ এসআইআর ফর্ম পূরণে সমস্যায় পড়ছেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকে সহায়তা শিবির চালু করা হয়েছে এবং কর্মীদের বাড়ি বাড়ি পাঠিয়ে ফর্ম পূরণে সাহায্য করা হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় সরকার নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই প্রক্রিয়া চালু করেছে। তাঁর দাবি, মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় থাকলে বিজেপি কোনোভাবেই মানুষের নাম বাদ দিতে পারবে না। অন্যদিকে, বাঁকুড়া সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সম্পাদক দুঃখিরানী মুদি‌ বলেন, কম শিক্ষিত মানুষের জন্য বুথ লেভেল কর্মী ও বিএলএ-২ দের এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। আতঙ্কের কারণ নেই, ফর্ম ফিল আপ সহ সব বিষয়েই সহায়তা করা হচ্ছে তাঁদের। তাঁর অভিযোগ, শাসক দল মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। তিনি দাবি করেন, এসআইআর রাজ্যে হবেই এবং সঠিকভাবেই হবে, এবং বাইরে কাজ করা মানুষদেরও কোনো অসুবিধা হবে না। বিজেপি বা তৃণমূলের আশ্বাসনের পর সবর অধ্যুষিত গ্রামের ধৈর্য মানুষগুলো জানেন হাজার প্রতিশ্রুতি বাতাসেই ভেসে যাবে কাটবে না তাঁদের জীবনের এই চাপ বাঁধা আঁধার!!
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram