মাটিতে নেমে শিক্ষা গুরুকুলের পড়ুয়াদের

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
লাভপুর : শিক্ষা মানেই শুধু বইয়ের পাতায় চোখ রেখে পড়াশোনা নয়। শ্রেণিকক্ষের বাইরে প্রকৃতি, মাটি, সমাজ এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে পরিচিত হওয়াও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই ভাবনাকেই সামনে রেখে এবার এক অভিনব উদ্যোগ দেখা গেল বীরভূমের লাভপুর কালিকাপুর ডাঙায়। বইয়ের পাতায় কৃষির পাঠ পড়ার পাশাপাশি এবার একেবারে মাঠে নেমে হাতে-কলমে কৃষিকাজের অভিজ্ঞতা পেল গুরুকুল আদর্শ বিদ্যাপীঠ এবং গুরুকুল নাট্য আশ্রমের পড়ুয়ারা। বৃহস্পতিবার আয়োজিত হল বার্ষিক ‘আনন্দ চাষ’ কর্মসূচি। আশ্রমের নিজস্ব কৃষিজমিতে ধানের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে এই বিশেষ কর্মসূচি পালন করা হয়। বিদ্যালয় এবং নাট্য আশ্রমের ছাত্রছাত্রীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেয় এই কর্মসূচিতে। তাদের সঙ্গে ছিল আদিবাসী পড়ুয়ারাও। সকাল থেকেই কর্মসূচিকে ঘিরে পড়ুয়াদের মধ্যে ছিল উৎসাহ এবং উদ্দীপনা। সাধারণত শ্রেণিকক্ষে কৃষি সম্পর্কে নানা বিষয় পড়ানো হয়। ধান কীভাবে উৎপাদন হয়, কৃষকের ভূমিকা কী, চাষের জন্য জমির প্রয়োজনীয়তা কতটা—এসব বিষয় পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জানা যায়। কিন্তু বইয়ে পড়া সেই বিষয়গুলিকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতেই এই উদ্যোগ। তাই এদিন শ্রেণিকক্ষের বদলে পড়ুয়াদের দেখা গেল একেবারে কৃষিজমিতে। তবে মাঠে নামার আগে ছিল আরও একটি বিশেষ আয়োজন। সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কৃষির গুরুত্ব এবং কৃষকের ভূমিকা তুলে ধরে পরিবেশন করে ‘কৃষি’ বিষয়ক একটি নাটক। নাটকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয় কৃষির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার গভীর সম্পর্ক। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব—বিভিন্ন বিষয় সহজ এবং আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরে পড়ুয়ারা। নাটক শেষে শুরু হয় মূল কর্মসূচি। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তত্ত্বাবধানে পড়ুয়ারা নিজেরাই মাঠে নেমে ধানের চারা রোপণ করে। হাতে ধানের চারা নিয়ে জমিতে দাঁড়িয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ। কেউ চারা নিয়ে জমিতে এগিয়ে যাচ্ছে, আবার কেউ নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে একের পর এক ধানের চারা রোপণ করছে। অনেক পড়ুয়ার কাছে এই অভিজ্ঞতা ছিল একেবারেই নতুন। শ্রেণিকক্ষে বসে কৃষির কথা শোনার সঙ্গে নিজের হাতে মাটিতে নেমে চাষের কাজ করার অভিজ্ঞতার পার্থক্যও তারা অনুভব করে। মাটিতে পা রেখে, কৃষিকাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে তারা বুঝতে পারে একটি ফসল উৎপাদনের পিছনে কতটা পরিশ্রম করতে হয়। গুরুকুল আদর্শ বিদ্যাপীঠ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, শিক্ষা কখনও শুধু বইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃতি, সমাজ এবং বাস্তব জীবনের সঙ্গে শিক্ষার যোগসূত্র তৈরি করাই তাঁদের অন্যতম লক্ষ্য। সেই কারণেই পড়ুয়াদের বিভিন্ন ধরনের কৃষিকাজের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। আশ্রমের কৃষিজমিতে শুধু ধান নয়, আলু, বিভিন্ন ধরনের সবজি এবং ফুল চাষও করা হয়। কৃষিকাজের বিভিন্ন পর্যায়ে পড়ুয়াদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ বা চারা রোপণ, ফসলের পরিচর্যা এবং উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায় সম্পর্কে পড়ুয়াদের ধারণা দেওয়া হয়।
মাটিতে নেমে শিক্ষা গুরুকুলের পড়ুয়াদের
ধান রোপণ করে কৃষির পাঠ, ‘আনন্দ চাষ’-এ গুরুকুলের পড়ুয়ারা

এই উদ্যোগের মাধ্যমে কৃষিকে শুধুমাত্র একটি পেশা হিসেবে দেখানো হচ্ছে না। বরং কৃষির সঙ্গে প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্কও বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একটি ধানের চারা কীভাবে ধীরে ধীরে বড় হয়ে ফসলে পরিণত হয়, তার পিছনে কৃষকের শ্রম কতটা গুরুত্বপূর্ণ—নিজেদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই বিষয়গুলি উপলব্ধি করার সুযোগ পাচ্ছে পড়ুয়ারা। গুরুকুল নাট্য আশ্রমের কর্ণধার উজ্জ্বল মুখোপাধ্যায় জানান, মাটির সঙ্গে পড়ুয়াদের সম্পর্ক গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তাঁর মতে, বর্তমান প্রজন্মের অনেক পড়ুয়াই কৃষিকাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে দূরে। তাই তাদের মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং কৃষির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই ‘আনন্দ চাষ’ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও একটি বিশেষ ঐতিহ্য। আশ্রমে উৎপাদিত ধান দিয়ে প্রতিবছর নবান্ন উৎসবের আয়োজন করা হয়। অর্থাৎ ধানের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ফসল উৎপাদন এবং সেই ফসল দিয়ে নবান্ন উদযাপন—পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই পড়ুয়াদের যুক্ত করা হয়। এর ফলে কৃষিকাজের সঙ্গে পড়ুয়াদের শুধুমাত্র ব্যবহারিক পরিচয় নয়, একটি আবেগের সম্পর্কও তৈরি হচ্ছে। তারা উপলব্ধি করতে পারছে, প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে যে ভাত পৌঁছয়, তার পিছনে রয়েছে কৃষকের দীর্ঘ পরিশ্রম, মাটির সঙ্গে লড়াই এবং প্রকৃতির উপর নির্ভরশীলতা। এদিনের কর্মসূচিতে আদিবাসী পড়ুয়াদের অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন পটভূমির ছাত্রছাত্রীরা একসঙ্গে মাঠে নেমে কৃষিকাজে অংশ নেয়। ফলে এই কর্মসূচি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক নয়, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতারও একটি বার্তা বহন করে। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের তত্ত্বাবধানে পড়ুয়ারা দলবদ্ধভাবে কাজ করে। এর ফলে তাদের মধ্যে সহযোগিতার মানসিকতা, শ্রমের প্রতি সম্মান এবং দায়িত্ববোধও তৈরি হয়। নিজের হাতে কাজ করার মাধ্যমে তারা বুঝতে পারে যে কোনও কাজই ছোট নয় এবং শ্রমের মর্যাদা সব ক্ষেত্রেই রয়েছে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ডিজিটাল শিক্ষার প্রসার দ্রুত বাড়ছে। শিশু-কিশোরদের একটা বড় অংশ দিনের অনেকটা সময় মোবাইল, কম্পিউটার বা অন্যান্য ডিজিটাল মাধ্যমের সঙ্গে কাটায়। সেই পরিস্থিতিতে পড়ুয়াদের প্রকৃতির কাছে নিয়ে এসে মাটির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার এই ধরনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। বইয়ে কৃষির সংজ্ঞা পড়ার পাশাপাশি মাঠে গিয়ে নিজের হাতে ধানের চারা রোপণ করা—এই দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে রয়েছে বড় পার্থক্য। আর সেই বাস্তব অভিজ্ঞতাই পড়ুয়াদের কাছে শিক্ষাকে আরও জীবন্ত করে তোলে। ‘আনন্দ চাষ’ তাই শুধুমাত্র ধান রোপণের একটি কর্মসূচি নয়। এটি আসলে শিক্ষার প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে বাস্তব জীবনকে শিক্ষার অংশ করে তোলার একটি প্রয়াস। যেখানে মাটি হচ্ছে শ্রেণিকক্ষ, কৃষিকাজ হচ্ছে পাঠ এবং প্রকৃতিই হয়ে উঠছে শিক্ষক। লাভপুর কালিকাপুর ডাঙার গুরুকুল আদর্শ বিদ্যাপীঠ এবং গুরুকুল নাট্য আশ্রমের এই উদ্যোগে একদিকে যেমন পড়ুয়ারা কৃষির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে, অন্যদিকে তাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে প্রকৃতি এবং কৃষকের প্রতি সম্মান। মাটির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে বাস্তব জীবনের শিক্ষা গ্রহণ করছে নতুন প্রজন্ম। সব মিলিয়ে, বৃহস্পতিবারের ‘আনন্দ চাষ’ কর্মসূচিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাই উঠে এল—শিক্ষা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকবে না। শিক্ষা ছড়িয়ে পড়বে মাঠে, প্রকৃতিতে এবং বাস্তব জীবনে। আর সেই শিক্ষারই অংশ হয়ে মাটিতে নেমে ধানের চারা রোপণ করল গুরুকুলের পড়ুয়ারা। বইয়ের পাতা থেকে মাঠের মাটি—এই পথেই যেন নতুন করে শিক্ষার অর্থ খুঁজে পেল তারা।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram