This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
পাণ্ডবেশ্বর : অবৈধ বালি খাদান ও ঘাটের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপের পর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় বালির সরবরাহ নিয়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। একসময় অবাধে চলা অবৈধ বালি উত্তোলনের ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হতো। সেই পরিস্থিতিতে প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়ে একের পর এক অবৈধ বালি খাদান ও ঘাট বন্ধ করে দেয়। এই পদক্ষেপকে সাধারণ মানুষ স্বাগত জানালেও এখন নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—অবৈধ বালি বন্ধ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য কি সরকারি নির্ধারিত মূল্যে পর্যাপ্ত বৈধ বালির ব্যবস্থা করা হয়েছে ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মঙ্গলবার পাণ্ডবেশ্বর বিডিও অফিসের সামনে বিক্ষোভ ও গণডেপুটেশন কর্মসূচির আয়োজন করেন এলাকার রাজমিস্ত্রি, দিনমজুর, ট্র্যাক্টর চালক এবং আবাস যোজনার উপভোক্তারা। তাঁদের দাবি, বালির অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় নির্মাণ শিল্প কার্যত ধাক্কা খেয়েছে। ফলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের বাড়ি তৈরির স্বপ্ন থমকে যাচ্ছে, অন্যদিকে হাজার হাজার নির্মাণ শ্রমিক কাজ হারিয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, আগে স্থানীয়ভাবে অনেক কম দামে বালি পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে বৈধভাবে বালি সংগ্রহ করতে গেলে দূরের সরকারি ঘাট থেকে চালান কাটতে হচ্ছে। কেন্দ্রা ঘাট থেকে একটি ট্র্যাক্টর বালির চালান তুলতেই প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এরপর পরিবহণ, ট্র্যাক্টর ভাড়া এবং শ্রমিকের খরচ যোগ করলে সেই বালির দাম ছয় হাজার টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। এত বেশি দামে বালি কিনে সাধারণ মানুষের পক্ষে নতুন বাড়ি নির্মাণ করা বা পুরনো বাড়ির কাজ শেষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন রাজমিস্ত্রি, সহকারী শ্রমিক এবং নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের কথায়, বালি না থাকলে নির্মাণ কাজ শুরু করা যায় না। আর কাজ না হলে প্রতিদিনের রোজগারও বন্ধ হয়ে যায়। অনেক শ্রমিকের পরিবার শুধুমাত্র দৈনিক মজুরির উপর নির্ভরশীল। দিনের কাজ বন্ধ থাকায় সংসার চালানো, সন্তানদের পড়াশোনা কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে উঠেছে। তাঁদের দাবি, অবৈধ বালি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও তার বিকল্প হিসেবে বৈধ ও সহজলভ্য সরবরাহ নিশ্চিত না করলে সাধারণ শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা বিপদের মুখে পড়বে। শুধু ব্যক্তিগত বাড়ি নির্মাণ নয়, সরকারি আবাস যোজনার কাজও বালির অভাবে থমকে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বহু উপভোক্তা জানিয়েছেন, সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে বাড়ি নির্মাণের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। কিন্তু সরকারি দামে বালি না পাওয়ায় তাঁরা কাজ এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন না।
সরকারি দামে বালি কোথায় ? পাণ্ডবেশ্বরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ
একদিকে যেমন প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হচ্ছে, অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণ শেষ করতে না পারার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অন্যতম প্রতিনিধি বিশ্বজিৎ মুখার্জী জানান, তাঁদের দাবি একটাই—সরকারি নির্ধারিত ন্যায্য মূল্যে পর্যাপ্ত বালি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, বিডিও অফিস, বিএলআরও অফিস এবং স্থানীয় থানায় একাধিকবার এই বিষয়ে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সমস্যার কোনও স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা আন্দোলনের পথে নেমেছেন। তাঁর হুঁশিয়ারি, এবারও যদি প্রশাসনের তরফে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এদিনের বিক্ষোভে উপস্থিত বহু রাজমিস্ত্রি ও শ্রমিক একই সুরে বলেন, তাঁরা কোনও বেআইনি কাজের পক্ষে নন। অবৈধ বালি খাদান বন্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সঙ্গে সরকারকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বৈধ বালি কিনতে পারেন। অন্যথায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষ, যাঁরা বহু বছরের সঞ্চয় দিয়ে নিজেদের একটি ছোট্ট বাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখেন। অন্যদিকে, ট্র্যাক্টর চালকদেরও দাবি, বালির সংকটের কারণে তাঁদের কাজও প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। আগে প্রতিদিন একাধিক ট্রিপ বালি বহন করা হলেও এখন কাজের সংখ্যা অনেকটাই কমে গিয়েছে। ফলে তাঁদের আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একইভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন বালি পরিবহণের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য শ্রমিকরাও। বিক্ষোভ চলাকালীন আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে একটি দাবিপত্র পাণ্ডবেশ্বরের বিডিও গোপাল সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বিডিও জানান, আন্দোলনকারীদের বক্তব্য এবং দাবিগুলি গ্রহণ করা হয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে এবং যথাযথভাবে বিবেচনার জন্য সুপারিশ করা হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সমাধানের আশ্বাসও দেওয়া হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় স্পষ্ট—অবৈধ বালি উত্তোলন বন্ধ করা প্রশাসনের দায়িত্ব এবং তা আইন মেনেই হওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে বৈধ বালি সরবরাহের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও সরকারের সমান গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কারণ নির্মাণ শিল্প শুধু বাড়ি তৈরির সঙ্গে জড়িত নয়, এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে রয়েছে। বালির অভাবে যদি নির্মাণ শিল্প থমকে যায়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে শ্রমিক, পরিবহণ কর্মী, ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সরকারি আবাস প্রকল্পের উপভোক্তাদের উপরও। এখন দেখার বিষয়, আন্দোলনকারীদের দাবি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। প্রশাসন যদি সরকারি মূল্যে পর্যাপ্ত বালি সরবরাহের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমবে, অন্যদিকে আবারও চাঙ্গা হবে নির্মাণ শিল্প এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। তবে ততদিন পর্যন্ত পাণ্ডবেশ্বরের এই আন্দোলন রাজ্যের বালি সংকট এবং নির্মাণ শিল্পের বর্তমান বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হিসেবেই থেকে যাবে।