মায়াপুর ইসকনের রাজাপুর জগন্নাথ মন্দিরে ঐতিহ্যবাহী স্নানযাত্রা, ভক্তদের ঢল

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
নদিয়া : ভক্তি, ঐতিহ্য এবং আধ্যাত্মিকতার এক অপূর্ব মিলনক্ষেত্রে পরিণত হল নদিয়ার মায়াপুর। জগন্নাথ সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ উৎসব স্নানযাত্রা উপলক্ষে সোমবার ভোর থেকেই ভক্তদের ঢল নামে ইসকনের রাজাপুর জগন্নাথ মন্দিরে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত হাজার হাজার ভক্তের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে গোটা মন্দির চত্বর। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, হরিনাম সংকীর্তন, শাস্ত্রসম্মত পূজার্চনা এবং ভক্তিমূলক পরিবেশে পালিত হয় বহু প্রতীক্ষিত এই ধর্মীয় অনুষ্ঠান। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠ পূর্ণিমা তিথিতে ভগবান জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলদেব এবং বোন সুভদ্রার মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটিকে জগন্নাথ সংস্কৃতিতে অত্যন্ত পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হয়। সেই ঐতিহ্য মেনেই এদিন ভোর থেকে শুরু হয় বিশেষ পূজা ও স্নানযাত্রার আয়োজন। মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাকে স্নানমণ্ডপে নিয়ে আসা হয়। এরপর বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ এবং পুরোহিতদের উপস্থিতিতে শাস্ত্রবিধি অনুসারে সম্পন্ন হয় মহাস্নান। পবিত্র গঙ্গাজল, চন্দন, দুধ, দই, মধু, ঘি, নারকেলের জল এবং বিভিন্ন সুগন্ধি দ্রব্য দিয়ে দেবতাদের অভিষেক করা হয়। প্রতিটি আচার ধর্মীয় নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয় এবং হাজার হাজার ভক্ত গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী থাকেন। সকালের প্রথম প্রহর থেকেই মন্দিরের প্রবেশপথে দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ে। শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যেমন ভক্তরা এসেছেন, তেমনি আমেরিকা, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশ, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল-সহ বিশ্বের নানা দেশ থেকেও অসংখ্য ইসকন ভক্ত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে মায়াপুরে উপস্থিত হন। আন্তর্জাতিক ভক্তসমাগমে মন্দির চত্বর যেন এক বিশ্বজনীন ভক্তি-উৎসবে পরিণত হয়। সারাদিন ধরে চলতে থাকে হরিনাম সংকীর্তন। করতাল, মৃদঙ্গের তালে তালে “হরে কৃষ্ণ, হরে রাম” মহামন্ত্রের ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। ভক্তদের নৃত্য, কীর্তন এবং প্রার্থনায় এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এই পবিত্র অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন এবং ভগবানের আশীর্বাদ লাভের জন্য প্রার্থনা করেন। পুরাণ অনুযায়ী, রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের সময় থেকেই স্নানযাত্রা উৎসবের প্রচলন। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে ভগবান জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাকে ১০৮টি পবিত্র কলসের জল দিয়ে স্নান করানো হয়। অতিরিক্ত জলস্নানের ফলে ভগবান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই স্নানপর্ব শেষ হওয়ার পর তাঁকে সাধারণ মানুষের দর্শনের বাইরে একটি বিশেষ কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়, যাকে বলা হয় ‘অনসর’
মায়াপুর ইসকনের রাজাপুর জগন্নাথ মন্দিরে ঐতিহ্যবাহী স্নানযাত্রা, ভক্তদের ঢল
স্নানযাত্রার পর অনসর পর্বে জগন্নাথ, পনেরো দিন বন্ধ থাকবে দর্শন

এই অনসর পর্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আগামী প্রায় এক পক্ষকাল অর্থাৎ পনেরো দিন ভগবান বিশ্রামে থাকবেন বলে বিশ্বাস করা হয়। এই সময় সাধারণ ভক্তদের জন্য মন্দিরে দর্শন বন্ধ থাকবে। পুরোহিতরাই নির্দিষ্ট নিয়মে তাঁর সেবা করবেন। এরপর নির্ধারিত দিনে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত নবযৌবন দর্শন, যখন নতুন রূপে আবার ভক্তদের সামনে আবির্ভূত হবেন জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা। স্নানযাত্রার আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হল গজবেশ। স্নানপর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর ভগবান জগন্নাথকে হাতির আদলে বিশেষ অলঙ্কারে সাজানো হয়। এই গজবেশের পেছনেও রয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক তাৎপর্য। ভক্তদের কাছে এই রূপ অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বছরের অন্যতম আকর্ষণ। সেই বিশেষ দর্শনের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন হাজার হাজার মানুষ। গজবেশে জগন্নাথদেবের দর্শন পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বহু ভক্ত। দিনভর মন্দিরে ছিল নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন। গীতা পাঠ, ভাগবত আলোচনা, বিশেষ পূজা, ভোগ নিবেদন, মহাপ্রসাদ বিতরণ এবং বৈষ্ণব ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরে ভক্তদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। মহাপ্রসাদ গ্রহণের জন্যও দীর্ঘ সারি লক্ষ্য করা যায়। ইসকনের স্বেচ্ছাসেবকরা সুশৃঙ্খলভাবে সমস্ত আয়োজন পরিচালনা করেন। এত বড় আন্তর্জাতিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তার বিষয়টিও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে মন্দির চত্বর এবং আশপাশের এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি ইসকনের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীও সারাদিন নজরদারিতে ছিল। প্রবেশপথে বিশেষ তল্লাশি, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং ভিড় সামলাতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ফলে বিপুল জনসমাগম হলেও কোথাও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার খবর পাওয়া যায়নি। মায়াপুরের স্নানযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বিশ্বজুড়ে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় আধ্যাত্মিক মিলনমেলা। এখানে ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভক্তি একসঙ্গে মিশে যায়। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষ একসঙ্গে হরিনাম সংকীর্তনে অংশ নেন, যা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর ভাবনাকে আরও একবার বাস্তবে তুলে ধরে। এই স্নানযাত্রার মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেল বহুল প্রতীক্ষিত রথযাত্রা উৎসবের প্রস্তুতি। অনসর পর্ব শেষে নবযৌবন দর্শনের মাধ্যমে পুনরায় ভক্তদের সামনে আসবেন ভগবান জগন্নাথ। তারপর মহাধুমধামে অনুষ্ঠিত হবে রথযাত্রা, যখন লক্ষ লক্ষ ভক্তের উপস্থিতিতে রথে আরোহণ করবেন জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রা। তাই সোমবারের এই স্নানযাত্রা কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, এটি জগন্নাথ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং আসন্ন রথযাত্রার শুভ সূচনা। ভক্তদের বিশ্বাস, এই পবিত্র দিনে ভগবানের স্নানযাত্রার দর্শন করলে জীবনে সুখ, শান্তি ও কল্যাণ লাভ হয়। আর সেই বিশ্বাসকে হৃদয়ে ধারণ করেই হাজার হাজার মানুষ এদিন মায়াপুরে এসে সামিল হলেন এক অনন্য ভক্তি, ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার মহোৎসবে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram