শেষ বিদায়ে অশ্রুসিক্ত শান্তিপুর, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেনা জওয়ানকে শ্রদ্ধা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
নদিয়া : শান্তিপুরের আকাশ যেন এদিন আরও ভারী। গোটা এলাকাজুড়ে শুধুই শোক, নীরবতা আর অশ্রু। যে মানুষটি দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে দেশের সীমান্ত রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই বীর সেনা জওয়ান কানাই সরকার শেষবারের মতো ফিরলেন নিজের জন্মভিটেতে— তবে আর জীবিত নয়, কফিনবন্দি হয়ে। সোমবার সকাল থেকেই নদীয়ার শান্তিপুর থানার ডংখিরা নিমতলা পাড়া এলাকায় মানুষের ঢল নামে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই আশপাশের গ্রাম-গঞ্জ থেকে হাজার হাজার মানুষ ছুটে আসেন। সকলের একটাই উদ্দেশ্য— দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই সাহসী সেনাসন্তানকে শেষবারের মতো শ্রদ্ধা জানানো। কফিনবন্দি মরদেহ যখন সেনাবাহিনীর গাড়ি থেকে নামানো হয়, তখন শোক আর আবেগে ভেঙে পড়েন পরিবারের সদস্যরা। কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়-স্বজন। দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরলেও আর কোনও কথা বলবেন না, পরিবারের পাশে দাঁড়াবেন না— এই বাস্তবতা মেনে নিতে পারছিলেন না কেউই। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কানাই সরকার দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে তাঁর কর্মস্থল ছিল রাজস্থানের যোধপুর। প্রতিদিনের মতো গত শুক্রবার রাতেও দায়িত্ব পালন শেষে নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিতে যান তিনি। কিন্তু পরদিন সকালে সহকর্মীরা তাঁকে ডাকাডাকি করেও কোনও সাড়া পাননি। এরপর দ্রুত তাঁকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। এই আকস্মিক মৃত্যুর খবর পৌঁছাতেই শোকের ছায়া নেমে আসে তাঁর পরিবারের পাশাপাশি গোটা এলাকায়। যাঁরা তাঁকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁদের কথায়— অত্যন্ত শান্ত, কর্তব্যপরায়ণ এবং সবার বিপদে পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষ ছিলেন কানাই সরকার। দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ ছিল অসীম। সোমবার ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহকর্মীরা পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তাঁর মরদেহ নিয়ে আসেন শান্তিপুরের বাড়িতে। কফিনটি জাতীয় পতাকায় মোড়ানো ছিল। সেনাবাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সম্মানের সঙ্গে কাঁধে করে মরদেহ বাড়ির সামনে নিয়ে আসেন। সেই দৃশ্য দেখে উপস্থিত বহু মানুষের চোখে জল চলে আসে।
শেষ বিদায়ে অশ্রুসিক্ত শান্তিপুর, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সেনা জওয়ানকে শ্রদ্ধা
জাতীয় পতাকায় মোড়া কফিন, শেষবারের মতো ভিটেমাটিতে ফিরলেন বীর সেনা জওয়ান কানাই সরকার

এরপর শুরু হয় শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পালা। প্রথমে পরিবারের সদস্যরা ফুল দিয়ে শেষ প্রণাম জানান। তারপর আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব এবং এলাকার অসংখ্য মানুষ একে একে কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। অনেকেই জাতীয় পতাকা হাতে “ভারত মাতা কি জয়” এবং “অমর রহে” ধ্বনি দিয়ে বীর জওয়ানকে শেষ বিদায় জানান। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে ফুলের মালা অর্পণ করেন সেনা আধিকারিকরা। বাজানো হয় সামরিক বিউগল। তারপর নিয়ম মেনে গান স্যালুটের মাধ্যমে সম্মান জানানো হয় বীর সেনা জওয়ান কানাই সরকারকে। সেই মুহূর্তে গোটা এলাকা যেন স্তব্ধ হয়ে যায়। একদিকে সামরিক শৃঙ্খলার দৃঢ়তা, অন্যদিকে পরিবারের অসহায় কান্না— দুই বিপরীত আবেগের মিশেলে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশ। উপস্থিত বহু মানুষ আবেগ সামলাতে পারেননি। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, কানাই সরকার শুধু তাঁদের এলাকার গর্বই ছিলেন না, তিনি ছিলেন নতুন প্রজন্মের কাছে এক অনুপ্রেরণা। দেশের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তাঁর এই অবদান কখনও ভোলা যাবে না। এলাকার প্রবীণদের মতে, ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ছিলেন কানাই সরকার। সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পরও গ্রামের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল অটুট। ছুটিতে বাড়ি এলেই সকলের সঙ্গে সময় কাটাতেন, এলাকার খোঁজখবর নিতেন এবং তরুণদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর অকাল প্রয়াণে পরিবার আজ দিশেহারা। প্রিয় মানুষটিকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী, সন্তান এবং অন্যান্য আত্মীয়রা। একই সঙ্গে গোটা শান্তিপুরও হারাল দেশের এক সাহসী, কর্তব্যনিষ্ঠ এবং সম্মানিত সন্তানকে। একজন সেনা জওয়ানের জীবন কেবল একটি পেশা নয়, তা দেশের প্রতি অঙ্গীকার, দায়িত্ব এবং আত্মত্যাগের প্রতীক। সেই আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সোমবার শান্তিপুর সাক্ষী থাকল এক আবেগঘন বিদায়ের। হাজারো মানুষের চোখের জল, সেনাবাহিনীর স্যালুট এবং জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন— সবকিছুই স্মরণ করিয়ে দিল, দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা মানুষদের প্রতি জাতির শ্রদ্ধা চিরকাল অটুট থাকবে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram