অবশেষে পুরি থেকে গ্রেফতার বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মন্ডল !
ব্যুরো রিপোর্ট : কয়েকদিনের লুকোচুরি, জল্পনা আর রাজনৈতিক চাপানউতোরের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে পুরী থেকে গ্রেফতার হলেন দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডল। দীর্ঘদিন ধরেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি ও সিবিআইয়ের নজরে ছিলেন তিনি। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর তাঁর বিরুদ্ধে তদন্তের গতি আরও বাড়ে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি। অবশেষে ওড়িশার পুরীর একটি হোটেল থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে সূত্রের খবর। এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক মহলে। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, গত কয়েকদিন ধরেই দিলীপ মণ্ডলের খোঁজে তৎপর ছিল পুলিশ। বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছিল। কিন্তু কোথাও তাঁর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। কার্যত “গরু খোঁজা” করে খুঁজছিল তদন্তকারীরা— এমন মন্তব্যও শোনা গিয়েছে রাজনৈতিক মহলের একাংশে। অবশেষে পুরীর একটি হোটেলে তাঁর অবস্থানের খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছয় তদন্তকারী দল। এরপর তাঁকে আটক করে গ্রেফতার করা হয়। জানা যাচ্ছে, গ্রেফতারের পর তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। যদিও সরকারি ভাবে এখনও পর্যন্ত তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ঠিক কোন মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে, কী কী ধারায় মামলা রুজু হয়েছে, তা নিয়েও আনুষ্ঠানিক বিবৃতি এখনও সামনে আসেনি। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এই ঘটনাকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। দিলীপ মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ ২৪ পরগনার রাজনীতিতে অত্যন্ত পরিচিত মুখ। তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা হিসেবেই এলাকায় পরিচিত ছিলেন তিনি। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাঁর বিপুল সম্পত্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। অভিযোগ ওঠে, তাঁর আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি তাঁর আর্থিক লেনদেন ও সম্পত্তির খতিয়ান খতিয়ে দেখতে শুরু করে। এর আগেও একাধিকবার দিলীপ মণ্ডলের বাড়ি ও বিভিন্ন সম্পত্তিতে তল্লাশি চালিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। বিশেষ করে পৈলানে তাঁর প্রাসাদতুল্য বাড়ি, বিশাল গেস্ট হাউস এবং অফিস ঘিরে তদন্তকারীদের আগ্রহ ছিল বেশি। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই গেস্ট হাউস ও অফিসকে কেন্দ্র করেই বহু ব্যবসায়িক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল।তবে সমস্ত অভিযোগ আগেই অস্বীকার করেছিলেন দিলীপ মণ্ডল। কয়েকদিন আগে সাংবাদিক সম্মেলন করে তিনি দাবি করেছিলেন, তাঁদের পরিবার বহুদিন ধরেই প্রোমোটারির ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সেই ব্যবসার সূত্রেই বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের সম্পত্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর বক্তব্য ছিল, সব সম্পত্তিই বৈধ এবং ব্যবসার আয় থেকেই তৈরি করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁকে টার্গেট করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

কিন্তু তদন্তকারী সংস্থাগুলির দাবি, বিষয়টি এতটা সরল নয়। সূত্রের খবর, বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন এবং একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে জোর করে তোলা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হত। এছাড়াও বিভিন্ন জমি ও নির্মাণ সংক্রান্ত বিষয়েও একাধিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে জানা যাচ্ছে। রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর পরিস্থিতি আরও বদলাতে শুরু করে। আগে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনিক স্তরে বিশেষ পদক্ষেপ দেখা যেত না, এখন তাঁদের বিরুদ্ধেই একের পর এক তদন্তে সক্রিয়তা বাড়ছে— এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। দিলীপ মণ্ডলের ক্ষেত্রেও সেই একই ছবি দেখা গিয়েছে বলে মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের। দিলীপ মণ্ডলের গ্রেফতারি ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা। বিরোধীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়ম করা হয়েছে। এখন আইন নিজের পথে কাজ করছে। অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশ এখনও প্রকাশ্যে খুব একটা প্রতিক্রিয়া না দিলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপের অভিযোগ তুলতে শুরু করেছেন দলের কিছু নেতা-কর্মী। স্থানীয় মানুষদের মধ্যেও এই ঘটনাকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিপুল সম্পত্তি নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা ছিল। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলানোর পরই হঠাৎ করে তদন্তের গতি বাড়া অনেক প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গ্রেফতার শুধু একজন বিধায়কের গ্রেফতার নয়, বরং রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও বড় বার্তা বহন করছে। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত, তল্লাশি ও গ্রেফতারির ঘটনা সামনে এসেছে। ফলে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, দিলীপ মণ্ডলের বিরুদ্ধে তদন্ত কতদূর এগোয়। তাঁর সম্পত্তির উৎস, আর্থিক লেনদেন, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং অভিযোগে উল্লিখিত তোলা আদায়ের বিষয়গুলি কতটা প্রমাণিত হয়, তার দিকেই নজর থাকবে। তদন্তকারী সংস্থাগুলি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আরও নতুন তথ্য সামনে আনতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, দিলীপ মণ্ডলের ঘনিষ্ঠ মহল এখনও দাবি করছে, তিনি নির্দোষ এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তবে গ্রেফতারের পর সেই দাবি কতটা জোরালোভাবে সামনে আসে, তা সময়ই বলবে। সব মিলিয়ে, পুরী থেকে বিষ্ণুপুরের তৃণমূল বিধায়ক দিলীপ মণ্ডলের গ্রেফতার রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন ফেলেছে। এখন নজর তদন্তের পরবর্তী ধাপের দিকে।
