This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
রানীগঞ্জ : শহরের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া এক গুরুতর ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে ঘিরে শুক্রবার দুপুর থেকেই এলাকাজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ, ওই বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক একাধিক ছাত্রীকে শারীরিকভাবে হেনস্তা করেছেন এবং তাঁদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেছেন। এই ঘটনায় শুধু একটি নয়, অন্তত পাঁচজন ছাত্রীর নাম সামনে এসেছে, যা গোটা ঘটনাটিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রায় ৪৫ বছর বয়সী শিক্ষক প্রশান্ত খায়ের, যিনি রানীগঞ্জের ইস্ট কলেজ পাড়া এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে কিছু অস্বস্তিকর আচরণের অভিযোগ ঘোরাফেরা করছিল, যদিও সেগুলি কখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে আসেনি। তবে সম্প্রতি এক তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রীর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনা হলে গোটা ঘটনাটি সামনে আসে এবং মুহূর্তের মধ্যেই এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্রীর পরিবারের অভিযোগ, ওই শিক্ষক ক্লাস চলাকালীন সময়ে ছাত্রীকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে অশালীন আচরণ করেন। বিষয়টি প্রথমে ছাত্রী বাড়িতে জানালে পরিবার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে নিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে। এরপরই আরও কয়েকজন ছাত্রীর পরিবার একই ধরনের অভিযোগ সামনে আনতে শুরু করে। অভিযোগের সংখ্যা বাড়তে থাকায় অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হন বহু অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। উত্তেজিত জনতা অভিযুক্ত শিক্ষককে ঘিরে ধরে এবং তাঁর উপর চড়াও হয়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকে এবং একসময় শিক্ষককে গণপ্রহারের মুখে পড়তে হয়। যদিও এই ধরনের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিয়মবিরুদ্ধ, তবুও ক্ষোভে ফেটে পড়া মানুষের আবেগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট-এর অধীনস্থ বাহিনী এসে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে অভিযুক্ত শিক্ষককে উদ্ধার করে এবং তাঁকে হেফাজতে নিয়ে যায়। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে এবং স্কুল চত্বরে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয় যাতে আর কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এরপর বিক্ষোভ আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে। স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথমে স্কুলের সামনে প্রতিবাদ দেখালেও পরে তারা মিছিল করে রানীগঞ্জ থানা-র সামনে গিয়ে বিক্ষোভে সামিল হন। তাঁদের দাবি ছিল, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে তার জন্য প্রশাসনকে কড়া নজরদারি চালাতে হবে।
শিক্ষককে ঘিরে ক্ষোভের বিস্ফোরণ, একাধিক ছাত্রীর হেনস্তার অভিযোগে তোলপাড়
অন্যদিকে এই ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলেও সাড়া পড়ে যায়। বিরোধী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি-র নেতৃত্ব ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রতিবাদে সামিল হন। দলের স্থানীয় প্রার্থী পার্থ ঘোষ রানীগঞ্জ থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের ঘটনা সমাজের জন্য লজ্জাজনক। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।” নির্যাতিত ছাত্রীদের পরিবারও পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। জানা গেছে, অন্তত পাঁচজন ছাত্রী তাঁদের পরিবারের মাধ্যমে অভিযোগ জানিয়েছে এবং পুলিশ তাঁদের বক্তব্য রেকর্ড করেছে। ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডেপুটি কমিশনার (ডিসিপি) ধ্রুব দাস জানান, “আমরা ইতিমধ্যেই একাধিক অভিযোগ পেয়েছি। প্রত্যেক অভিযোগকারীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে এবং পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়, তাহলে আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।” ঘটনার জেরে স্কুলের পরিবেশও চরমভাবে প্রভাবিত হয়েছে। অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকেই তাঁদের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো একটি নিরাপদ জায়গায় এই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে স্কুল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও। অনেকেই দাবি করছেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে তার জন্য স্কুলে কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে শিশুদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনার পর আবারও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, শুধু শিক্ষার মান উন্নয়নই নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। প্রশাসন, স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং অভিভাবকদের মধ্যে সমন্বয় রেখে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব। এই ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে এবং পুলিশ সমস্ত দিক খতিয়ে দেখছে। অভিযুক্ত শিক্ষক বর্তমানে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন এবং আদালতে তোলার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। পুরো ঘটনার দিকে নজর রয়েছে জেলা প্রশাসন ও উচ্চপদস্থ কর্তাদের। রানীগঞ্জের এই ঘটনা শুধু একটি এলাকার নয়, গোটা সমাজের জন্য একটি সতর্কবার্তা। শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে আরও সচেতন হওয়া এবং যেকোনও অভিযোগ দ্রুত গুরুত্ব সহকারে নেওয়া এখন সময়ের দাবি।