পুত্রবধূকে ধর্ষণের দায়ে শ্বশুরের যাবজ্জীবন !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
উঃ ২৪ পরগনা : সম্পর্কের পবিত্রতাকে কলঙ্কিত করা এক নৃশংস ঘটনার মামলায় দৃষ্টান্তমূলক রায় দিল বারাসাত আদালত। নিজের পুত্রবধূকে ধারাবাহিকভাবে ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত শ্বশুর, ৪৪ বছর বয়সী জয়নাল মন্ডলকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। শুধু তাই নয়, আদালত ১ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং নির্যাতিতার জন্য ৬ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে। এই রায়কে ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে, পাশাপাশি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন নির্যাতিতার পরিবার। ঘটনাটি উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর থানার অন্তর্গত একটি এলাকার। মামলার নথি অনুযায়ী, বছর কুড়ির এক গৃহবধূ তাঁর স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছিলেন। তাঁর স্বামী পেশায় ফেরিওয়ালা হওয়ায় দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হত। সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে অভিযুক্ত শ্বশুর জয়নাল মন্ডল প্রথমে কুপ্রস্তাব দিতে শুরু করে এবং পরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় জোরপূর্বক ধর্ষণ চালায় বলে অভিযোগ। অভিযোগ অনুযায়ী, এই নির্যাতন একদিন বা একবারের ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। ভয়ে, লজ্জায় এবং সামাজিক চাপে প্রথমদিকে মুখ খুলতে পারেননি ওই তরুণী। কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন আর চুপ করে থাকেননি। সাহস সঞ্চয় করে তিনি তাঁর স্বামীকে সমস্ত ঘটনা জানান। স্ত্রীর কাছ থেকে এমন অভিযোগ শুনে প্রথমে হতবাক হয়ে যান স্বামী। কিন্তু পরে স্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল অশোকনগর থানা-য় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নেয় পুলিশ এবং পরদিনই অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়। তবে এই লড়াই সহজ ছিল না। নির্যাতিতা যখন প্রথমে স্থানীয়ভাবে বিচার চাওয়ার চেষ্টা করেন, তখন তিনি পাননি সমর্থন—বরং সম্মুখীন হন অপমানের। অভিযোগ, একটি সালিশি সভায় তাঁকে অমানবিকভাবে জানানো হয়, যেহেতু শ্বশুরের সঙ্গে তাঁর শারীরিক সম্পর্ক হয়েছে, তাই ভবিষ্যতে তাকেই ‘স্বামী’ হিসেবে মেনে নিতে হবে। এই মন্তব্য শুধু অবমাননাকরই নয়, বরং সমাজের এক অন্ধকার দিককেও সামনে এনে দেয়। এই চরম অপমান এবং নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশে ওই তরুণী ও তাঁর স্বামী এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু তাতেও তাঁদের ন্যায়বিচারের লড়াই থেমে থাকেনি। আইনের ওপর ভরসা রেখে তাঁরা লড়াই চালিয়ে যান।
পুত্রবধূকে ধর্ষণের দায়ে শ্বশুরের যাবজ্জীবন !
পুত্রবধূ ধর্ষণে শ্বশুরের যাবজ্জীবন, বারাসাত আদালতের কড়া রায়ে কাঁপল সমাজ
মামলার স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর তীর্থঙ্কর পাল জানান, এই মামলায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। ট্রায়াল শুরু হওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই সাক্ষ্যগ্রহণ ও শুনানি সম্পন্ন হয়। আদালত সমস্ত প্রমাণ ও সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৬(২)(f) ধারায় অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে। বিচারকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই অপরাধ শুধু আইনের দৃষ্টিতে নয়, মানবিকতার দিক থেকেও অত্যন্ত জঘন্য। একজন শ্বশুর, যিনি পরিবারের একজন অভিভাবকস্বরূপ, তাঁর হাতেই যখন এমন অপরাধ সংঘটিত হয়, তখন তা সমাজের নৈতিক ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দেয়। তাই এই ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিই প্রাপ্য বলে মনে করেছে আদালত। বারাসাত পুলিশ জেলার পক্ষ থেকেও এই রায়কে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুত তদন্ত, চার্জশিট দাখিল এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াকে তারা প্রশাসনিক দক্ষতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। পুলিশের এক আধিকারিক জানান, “এ ধরনের মামলায় দ্রুত বিচার হওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে নির্যাতিতারা ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা রাখতে পারেন।” এই রায়ের পর নির্যাতিতার পরিবার কিছুটা হলেও স্বস্তি পেয়েছে। দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা এবং সামাজিক অপমানের পর অবশেষে ন্যায়বিচার পাওয়ায় তাঁদের চোখে জল, কিন্তু সেই জল স্বস্তির। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই রায় ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। সমাজের বিভিন্ন মহল মনে করছে, এই রায় একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল। এটি শুধু একটি মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং একটি শক্ত বার্তা—নারীর উপর নির্যাতন করলে, সে যেই হোক না কেন, আইনের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যাবে না। একইসঙ্গে এই ঘটনা সমাজের কিছু কুপ্রথা ও মানসিকতার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন তোলে। যেখানে নির্যাতিতাকে দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা করা হয়, সেখানে সচেতনতা এবং মানসিকতার পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। আইনের পাশাপাশি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও বদল দরকার, যাতে ভবিষ্যতে কোনও নির্যাতিতাকে এভাবে অপমানিত হতে না হয়। সব মিলিয়ে, বারাসাত আদালত-এর এই রায় একদিকে যেমন নির্যাতিতার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করল, তেমনি অন্যদিকে সমাজের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিল—অপরাধ যতই ঘরের ভেতরের হোক না কেন, তার শাস্তি অনিবার্য। এখন প্রয়োজন এই বার্তাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে প্রতিটি নারী নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারেন।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram