ব্ল্যাকবোর্ড- খাতা-কলমও নেই—খোলা মাঠেই গৃহবধূদের সচেতনতার পাঠশালা রাজ্য পুলিশের

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : বই নেই, খাতা নেই, নেই কোনও ব্ল্যাকবোর্ড। নেই বেঞ্চ, নেই শ্রেণিকক্ষের চার দেওয়ালও। তবুও সারি দিয়ে ত্রিপলের উপর বসে মন দিয়ে কথা শুনছেন একদল মহিলা। কারও কোলে সন্তান, কেউ এসেছেন সংসারের কাজ সামলে, আবার কেউ দিনমজুরির কাজ থেকে সময় বের করে হাজির হয়েছেন এই আসরে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, কোনও গ্রামের স্কুলের ক্লাস চলছে। কিন্তু আদতে এটি কোনও স্কুল নয়, নয় কোনও সাধারণ টিউশনও। এখানে অঙ্ক শেখানো হচ্ছে না, বাংলা কিংবা ইংরেজির বর্ণপরিচয়ও নয়। বরং শেখানো হচ্ছে এমন কিছু পাঠ, যা সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবন, নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। নিজের অধিকার কী, বিপদের সময় কী করতে হবে, প্রতারণার হাত থেকে কীভাবে নিজেকে বাঁচাতে হবে, বাল্যবিবাহের মতো সামাজিক ব্যাধি কীভাবে রুখতে হবে—এই সমস্ত বিষয়েই চলছে পাঠ। আর এই অন্যরকম পাঠশালার শিক্ষক ? খোদ রাজ্য পুলিশের আধিকারিকরা। কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রত্যন্ত এলাকা বিনোদনপুর, শশীপুর এবং ইটাডাঙায় মলানদিঘী পুলিশ ফাঁড়ির উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এমনই এক বিশেষ সচেতনতা শিবির। প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদের কাছে পৌঁছে তাঁদের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা এবং বর্তমান সময়ের বিপদ সম্পর্কে সচেতন করতেই এই উদ্যোগ বলে জানা গিয়েছে। শহর থেকে বহু দূরের এই এলাকাগুলিতে এখনও অনেক পরিবার নানা সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটায়। সরকারি প্রকল্প, আইনি অধিকার, নারী সুরক্ষা কিংবা সাইবার প্রতারণার মতো বিষয় সম্পর্কে অনেকেরই পর্যাপ্ত ধারণা নেই। ফলে সচেতনতার অভাবে কখনও প্রতারণার শিকার হতে হয়, কখনও আবার সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েও সঠিক জায়গায় অভিযোগ জানাতে পারেন না অনেকে। এই পরিস্থিতিতেই গ্রামবাসীদের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল পুলিশ। মলানদিঘী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ রাজেশ ভট্টাচার্যের উদ্যোগে আয়োজিত এই সচেতনতা শিবিরে উপস্থিত ছিলেন পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী, মহিলা পুলিশকর্মী এবং ভিলেজ পুলিশকর্মীরা। একেবারে ক্লাস নেওয়ার ভঙ্গিতে গ্রামের মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন তাঁরা। তবে এই ক্লাসে কোনও বই খুলতে হয়নি। কোনও প্রশ্নের উত্তর লিখে খাতায় জমাও দিতে হয়নি। বরং নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতা, সমস্যা এবং সম্ভাব্য বিপদের কথা সামনে রেখে সরাসরি আলোচনা করেন পুলিশ আধিকারিকরা। শিবিরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ। পুলিশের তরফে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে কোনও মেয়ের বিয়ে দেওয়া উচিত নয়। শুধুমাত্র সামাজিক রীতি বা পারিবারিক চাপে পড়ে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া নয়, তাঁদের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে অভিভাবকদের। মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে উৎসাহ দিতে হবে এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প ও সুযোগের সুবিধা নিয়ে তাঁদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। কারণ একটি মেয়ের হাতে বই তুলে দেওয়া শুধু একজনকে শিক্ষিত করা নয়, গোটা একটি পরিবারকে ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী করে তোলা। এর পাশাপাশি আলোচনা হয় মহিলাদের উপর নির্যাতন এবং পারিবারিক হিংসা নিয়েও। বাড়ির ভিতরে কোনও মহিলা অত্যাচারের শিকার হলে অনেক সময় সামাজিক চাপ, লজ্জা কিংবা পরিবারের ভয়ে তিনি মুখ খুলতে পারেন না। প্রত্যন্ত এলাকায় এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। তাই পুলিশ আধিকারিকরা তাঁদের আশ্বস্ত করেন—কোনও ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, হয়রানি কিংবা বিপদের মুখে পড়লে চুপ করে থাকার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। নিজের সমস্যা নিয়ে পুলিশের কাছে আসতে কোনও ভয় বা সংকোচের কারণ নেই। শিবিরে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় সাইবার প্রতারণা নিয়েও।
ব্ল্যাকবোর্ড- খাতা-কলমও নেই—খোলা মাঠেই গৃহবধূদের সচেতনতার পাঠশালা রাজ্য পুলিশের
বই-খাতা নয়, জীবন শেখাচ্ছে পুলিশ ! প্রত্যন্ত গ্রামে ত্রিপলের উপর সচেতনতার পাঠশালা

বর্তমানে মোবাইল ফোন পৌঁছে গিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের হাতেও। আর সেই সুযোগকেই কাজে লাগাচ্ছে প্রতারকরা। কখনও সরকারি প্রকল্পের নাম করে ফোন, কখনও অচেনা নম্বর থেকে যোগাযোগ, আবার কখনও লোভনীয় অফার দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা—প্রতারণার পদ্ধতি ক্রমশ বদলাচ্ছে। তাই গ্রামবাসীদের সহজ ভাষায় বোঝানো হয়, অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে কোনও তথ্য দেওয়া যাবে না। ফোনের ওপারে থাকা ব্যক্তি নিজেকে সরকারি আধিকারিক, ব্যাংক কর্মী বা অন্য কোনও পরিচিত প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি বলে দাবি করলেও যাচাই না করে তাঁর কথায় বিশ্বাস করা যাবে না। বিশেষ করে ওটিপি, ব্যাংক সংক্রান্ত তথ্য, ব্যক্তিগত নথির তথ্য কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোনও গোপন তথ্য কোনও অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না। পুলিশ আধিকারিক তাপস চক্রবর্তী বলেন, অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে সতর্ক থাকতে হবে। অপরিচিত কেউ এলাকায় এসে নাম-পরিচয় বা ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইলে কোনও তথ্য দেওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে অন্নপূর্ণা যোজনা-সহ রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের নাম করে ফোন এলে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কোনও পরিস্থিতিতেই ফোনে ওটিপি দেওয়া যাবে না। কারণ প্রতারকরা অনেক সময় মানুষের সরকারি প্রকল্প পাওয়ার আগ্রহকেই হাতিয়ার করে প্রতারণা করে। তাই কোনও প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কেউ ফোন করলে প্রথমেই তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি। শুধু সাইবার প্রতারণা নয়, এলাকার বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও গ্রামবাসীদের সঙ্গে আলোচনা করেন পুলিশকর্মীরা। দৈনন্দিন জীবনে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, কোথায় সতর্ক থাকা প্রয়োজন, কোনও অপরাধ বা সন্দেহজনক ঘটনা চোখে পড়লে কীভাবে পুলিশকে জানাতে হবে—এসব বিষয়ও উঠে আসে আলোচনায়। এই কর্মসূচির আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল পুলিশ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দূরত্ব কমানো। অনেক প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ এখনও পুলিশের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করেন। পুলিশের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগও তাঁদের সবসময় হয় না। সেই জায়গা থেকেই এই ধরনের সচেতনতা শিবিরের গুরুত্ব অনেক বেশি। গ্রামের মানুষের পাশে বসে, তাঁদের ভাষায় তাঁদের সমস্যার কথা শুনে পুলিশ আধিকারিকরা যে বার্তা দিলেন, তা শুধু একটি দিনের সচেতনতা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ সচেতনতা মানে শুধু বিপদ ঘটলে ব্যবস্থা নেওয়া নয়। বিপদ ঘটার আগেই বিপদকে চিনে নেওয়া এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখার ক্ষমতা তৈরি করাও সচেতনতারই অংশ। আর তাই এই পাঠশালায় বই নেই, খাতা নেই, নেই ব্ল্যাকবোর্ড। তবু এখানে যে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, তার মূল্য কোনও পাঠ্যবইয়ের চেয়ে কম নয়। একদিকে বাল্যবিবাহ রোধের বার্তা, অন্যদিকে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার সাহস। তার সঙ্গে সাইবার প্রতারণা থেকে বাঁচার কৌশল এবং সরকারি প্রকল্পের নামে প্রতারণা ঠেকানোর সতর্কতা—সব মিলিয়ে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সচেতনতার পাঠ দিল পুলিশ। ত্রিপলের উপর বসে গ্রামের মহিলাদের এই ক্লাস হয়তো দেখতে খুব সাধারণ। কিন্তু এই সাধারণ আয়োজনের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বড় একটি বার্তা—আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি মানুষের কাছে পৌঁছে তাঁদের সচেতন করাও পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। আর সেই দায়িত্ব পালন করতেই এবার শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে গ্রামের মাঠে, মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল পুলিশ। বই ছাড়া পাঠশালা, ব্ল্যাকবোর্ড ছাড়া ক্লাস—কিন্তু শিক্ষার বিষয় জীবন। আর সেই শিক্ষাই হয়তো আগামী দিনে বহু মানুষকে প্রতারণা, নির্যাতন এবং সামাজিক বিপদের হাত থেকে রক্ষা করবে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram