‘ভুতুড়ে’ লোকের নামে বাড়ির টাকা, আসল মানুষ মাটির ঘরে !! কাটমানির অভিযোগে তোলপাড় দেবশালা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
পূর্ব বর্ধমান : পুকুর চুরি, কয়লা চুরি, বালি চুরির অভিযোগের পর এবার আরও বিস্ফোরক অভিযোগ। গরিব মানুষের মাথার উপর পাকা ছাদ দেওয়ার জন্য বরাদ্দ সরকারি বাড়িই নাকি ‘গায়েব’! সরকারি নথিতে রয়েছে বৈধ উপভোক্তার নাম। সরকারি আবাস যোজনার তালিকায় রয়েছে তাঁর নাম। এমনকি অভিযোগ, নথিতে সেই উপভোক্তার নামে বাড়ি তৈরি সম্পূর্ণ বলেও দেখানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তবের ছবিটা একেবারেই আলাদা। যাঁর নামে বাড়ি বরাদ্দ, সেই উপভোক্তাই আজও বসবাস করছেন মাটির ঘরে। আর এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই পূর্ব বর্ধমানের দেবশালা গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে সরকারি আবাস যোজনার সেই বাড়ি গেল কোথায়? সরকারি প্রকল্পের টাকা কোথায় খরচ হল? কার হাতে গেল সেই টাকা? আর যদি সত্যিই অন্য কেউ সেই বাড়ির সুবিধা নিয়ে থাকেন, তাহলে কীভাবে প্রকৃত উপভোক্তার নামে থাকা সরকারি সুবিধা অন্যের কাছে পৌঁছে গেল? গরিব মানুষের জন্য পাকা বাড়ি তৈরি করে দেওয়ার লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার মতো সরকারি প্রকল্প। যাঁদের মাথার উপর নিরাপদ ছাদ নেই, যাঁরা মাটির বাড়িতে কোনওরকমে দিন কাটান, তাঁদের জন্যই এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাড়ি তৈরির অর্থ বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু দেবশালা এলাকায় ওঠা অভিযোগ সেই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েই একাধিক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অভিযোগ, একাধিক ক্ষেত্রে প্রকৃত উপভোক্তার নামে আবাস যোজনায় বাড়ি তৈরি হয়েছে বলে সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই উপভোক্তার হাতে পৌঁছয়নি সেই বাড়ি কিংবা তার সুবিধা। এমনকি অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁদের নামে বরাদ্দ অর্থ অন্য কেউ তুলে নিয়ে থাকতে পারেন এবং সেই টাকায় বাড়ি তৈরি করে অন্য কেউ বসবাস করছেন। ঘটনার কথা সামনে আসতেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। পাশাপাশি বঞ্চিতদের মধ্যে ক্ষোভও ক্রমশ বাড়ছে। অভিযোগকারীদের মধ্যে রয়েছেন দেবশালা গ্রামের বাসিন্দা আনন্দ রুইদাস। তাঁর দাবি, তিনি মাটির বাড়িতে বসবাস করেন। আবাস যোজনার সার্ভের সময় তাঁর বাড়ির ছবিও তোলা হয়েছিল এবং তাঁর নামও সেই তালিকায় ওঠে। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আশা করেছিলেন, এবার হয়তো সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে তাঁরও একটি পাকা বাড়ি হবে। কিন্তু পরে নতুন করে সার্ভের সময় তিনি জানতে পারেন, তাঁর নামে নাকি ইতিমধ্যেই বাড়ি তৈরি হয়ে গিয়েছে। এমনকি তাঁর নামে সরকারি টাকা বরাদ্দ হওয়ার কথাও জানানো হয়। অর্থাৎ, যে মানুষটি এখনও মাটির বাড়িতে বসবাস করছেন, সরকারি নথিতে তাঁর নামে নাকি ইতিমধ্যেই আবাস সম্পূর্ণ! এই জায়গাতেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি সত্যিই তাঁর নামে বাড়ি তৈরি হয়ে থাকে, তাহলে সেই বাড়ি কোথায়? কে সেই বাড়িতে থাকছেন? তাঁর নামে বরাদ্দ টাকা কে পেয়েছেন? আর কীভাবে সরকারি ব্যবস্থার নজর এড়িয়ে এই ঘটনা ঘটল? আনন্দ রুইদাসের মতো আরও কয়েকজন বঞ্চিত উপভোক্তার অভিযোগ, তাঁদের নাম ব্যবহার করে আবাস তৈরি দেখানো হয়েছে। অথচ তাঁরা প্রকল্পের প্রকৃত সুবিধা পাননি।
‘ভুতুড়ে’ লোকের নামে বাড়ির টাকা, আসল মানুষ মাটির ঘরে !! কাটমানির অভিযোগে তোলপাড় দেবশালা
গরিবের আবাস ‘গায়েব’! বৈধ উপভোক্তার নামে বাড়ি সম্পূর্ণ, আজও মাটির ঘর

এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে দেবশালা পঞ্চায়েত এলাকায় বিক্ষোভও দেখান বঞ্চিত উপভোক্তারা। তাঁদের দাবি, শুধুমাত্র মৌখিক আশ্বাস নয়, গোটা আবাস তালিকা প্রকাশ্যে আনতে হবে। কার নামে বাড়ি বরাদ্দ হয়েছিল, কার নামে টাকা ছাড়া হয়েছে, কোন বাড়ি বাস্তবে তৈরি হয়েছে এবং সেই বাড়িতে বর্তমানে কে বসবাস করছেন—সবকিছু প্রকাশ্যে আনার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি বিক্ষোভকারীদের দাবি, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। সরকারি প্রকল্পের টাকা নিয়ে যদি কোনও অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা হোক এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এই ঘটনায় আরও একটি অভিযোগ সামনে এসেছে—কাটমানির। অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে কোথাও টাকা লেনদেন হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা এখনও প্রমাণিত নয়। তবে প্রশ্ন উঠছে, প্রকৃত উপভোক্তার নাম তালিকায় থাকার পরেও যদি তিনি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে সেই প্রক্রিয়ায় কোথাও গলদ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এদিকে, দেবশালা গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান বৃথিকা মেটে অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তাঁর দাবি, যে ঘটনাগুলির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলি তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার আগের সময়ের। অর্থাৎ, বর্তমান পঞ্চায়েত নেতৃত্বের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগে যে অনিয়মের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলি বর্তমান সময়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। অন্যদিকে, এই ঘটনাকে হাতিয়ার করে সরব হয়েছে বিজেপিও। বিজেপি নেতা সৌমেন পাত্রের দাবি, এটি অত্যন্ত গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। তাঁর মতে, গরিব মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যদি প্রকৃত উপভোক্তার কাছে না পৌঁছয়, তাহলে গোটা বিষয়টির দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। রাজনৈতিক অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মাঝেই এখন মূল প্রশ্নটা থেকে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার কথা যাঁদের, তাঁদের নাম যদি তালিকায় থাকে, তাহলে তাঁদের ঘর কোথায়? যদি সরকারি নথিতে কোনও বাড়িকে সম্পূর্ণ বলে দেখানো হয়, তাহলে সেই বাড়ির বাস্তব অবস্থান কী? আর সরকারি টাকা যদি সত্যিই বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে সেই টাকা কোন অ্যাকাউন্টে গিয়েছে, কে তুলেছেন এবং কীভাবে খরচ হয়েছে—তার হিসেবই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলির উত্তর পেতে প্রয়োজন নথিপত্রের স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত। বিশেষ করে আবাস যোজনার মতো প্রকল্প সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত। মাটির ঘরে বসবাস করা একটি পরিবার যখন পাকা বাড়ির আশায় সরকারি তালিকায় নিজের নাম দেখে, তখন সেই আশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নিরাপত্তা, সম্মান এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন। সেই সুবিধা যদি কাগজে-কলমে সম্পূর্ণ হয়ে যায়, অথচ বাস্তবে উপভোক্তা সেই সুবিধা না পান, তাহলে তা শুধু একটি প্রশাসনিক ত্রুটির প্রশ্ন নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে একজন গরিব মানুষের অধিকার। দেবশালায় ওঠা অভিযোগ সত্যি হলে, প্রশ্ন উঠবেই—এই অনিয়মের পিছনে কারা? আর অভিযোগ যদি ভুল হয়, তাহলেও প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সেই সত্য সামনে আনা। কারণ সরকারি প্রকল্পের টাকা জনগণের টাকা। সেই টাকা কোনওভাবেই অপচয় বা দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে না। তাই এখন দেবশালার মানুষের দাবি একটাই—আবাস যোজনার সম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ হোক, নথি খতিয়ে দেখা হোক, প্রকৃত উপভোক্তাদের বক্তব্য নেওয়া হোক এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। গরিবের মাথার উপর পাকা ছাদ দেওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে আবাস প্রকল্প, সেই স্বপ্ন যদি সত্যিই কোনও অনিয়মের কারণে ভেঙে যায়, তাহলে দায় কার? দেবশালার বঞ্চিত মানুষের সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজতে হবে প্রশাসনকে। গরিবের ঘরের টাকা যদি সত্যিই অন্যের হাতে গিয়ে থাকে, তাহলে সেই টাকা গেল কোথায়, আর এর পিছনে কারা—এই প্রশ্নের উত্তরই এখন চাইছে দেবশালা।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram