সরকার পাল্টেছে, পাল্টায়নি চাঁদার কারবার ! গেরুয়া কুপনে টাকা তোলা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
গুসকরা : সরকার পাল্টে গিয়েছে। তৃণমূলের জায়গায় রাজ্যে এসেছে বিজেপি। বদলেছে রাজনৈতিক সমীকরণ, বদলেছে ক্ষমতার রং। কিন্তু বদলেছে কি চাঁদা তোলার সেই পুরনো সংস্কৃতি? তোলাবাজির বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজ্যের বিজেপি নেতৃত্ব বারবার কড়া বার্তা দিয়েছেন। ব্যবসায়ী, পরিবহণ কর্মী কিংবা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জোর করে কোনওভাবেই টাকা তোলা যাবে না—রাজনৈতিক নেতৃত্বের তরফে এমন বার্তাই বারবার সামনে এসেছে। কিন্তু পূর্ব বর্ধমানের গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে সেই নির্দেশের কার্যকারিতা নিয়েই উঠছে একাধিক প্রশ্ন। অভিযোগ, গত চার-পাঁচ দিন ধরে গুসকরা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো বিভিন্ন রুটের বাস থেকে কুপনের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা আদায় করা হচ্ছে। প্রতিটি বাস থেকে নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা করে। কিন্তু এই টাকা কারা তুলছে, কোন সংগঠনের নামে তুলছে এবং সেই টাকার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী—তা নিয়েই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। কারণ যে কুপনের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেখানে কোনও রাজনৈতিক দলের নাম নেই, নেই কোনও শ্রমিক সংগঠনের নামও। কুপনে রয়েছে শুধুমাত্র একটি গৈরিক পতাকার ছবি। আর সেই কারণেই গোটা বিষয়টি ঘিরে আরও জোরালো হয়েছে রাজনৈতিক প্রশ্ন। যদি এটি কোনও সংগঠনের অনুদান হয়, তাহলে সেই সংগঠনের নাম কুপনে উল্লেখ করা নেই কেন? টাকা সংগ্রহের উদ্দেশ্যই বা কী? সংগৃহীত অর্থের হিসাব কোথায় থাকবে? আর যদি এটি বাসস্ট্যান্ডে পরিষেবা দেওয়া কর্মীদের খরচ মেটানোর জন্য নেওয়া হয়, তাহলে সেই বিষয়টি প্রকাশ্যে স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে না কেন? এই প্রশ্নগুলিই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গুসকরা বাসস্ট্যান্ডে। উল্লেখ্য, গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের প্রবেশমুখে একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের শ্রমিক সংগঠনের ইউনিয়ন অফিস ছিল। সেই অফিস থেকেই বিভিন্ন রুটের বাস পরিচালনার কাজ করা হত বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। ক্ষমতার পালাবদলের পর বদলে যায় সেই ইউনিয়ন অফিসের চেহারাও। অভিযোগ, আগে যেখানে তৃণমূলের শ্রমিক সংগঠনের প্রভাব ছিল, এখন সেখানে উড়ছে বিজেপির পতাকা। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে বিজেপির শ্রমিক সংগঠন ভারতীয় মজদুর সংঘ বা BMS-এর পতাকাও। ফলে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বাসস্ট্যান্ডের সংগঠনগত পরিস্থিতিতেও যে পরিবর্তন এসেছে, তা স্পষ্ট বলেই দাবি স্থানীয়দের একাংশের। এরই মধ্যে নতুন করে ৩০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গুসকরা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ানো বাসগুলির কাছ থেকে পুরসভার তরফে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ টাকা প্রবেশ ফি নেওয়া হয়। পুরসভার কর্মীরা নির্দিষ্ট কুপনের মাধ্যমে সেই টাকা সংগ্রহ করেন। অর্থাৎ বাসস্ট্যান্ড ব্যবহারের জন্য পুরসভার তরফে নেওয়া এই অর্থের বিষয়টি আলাদা। কিন্তু অভিযোগ, তার পাশাপাশি চলতি মাসের শুরু থেকে আরও ৩০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন বাসের কাছ থেকে। আর এই অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টিই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে। কারণ দুটি পৃথক অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি তৈরি হলে বাস মালিক, চালক কিংবা পরিবহণ কর্মীদের মধ্যেও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, যদি কোনও সংগঠনের নামে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাহলে কুপনে সেই সংগঠনের নাম, উদ্দেশ্য এবং অর্থ সংগ্রহের কারণ স্পষ্ট থাকা উচিত। কারণ স্বচ্ছতার প্রশ্নটি এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ভারতীয় মজদুর সংঘের জেলা নেতৃত্বের দাবি, তাঁদের সংগঠন সরাসরি কোনও চাঁদা তুলছে না। তাঁদের বক্তব্য, সংগঠনের অনুমতি নিয়ে গুসকরা বাস শ্রমিক সংগঠন এই অনুদান সংগ্রহ করছে। বাসস্ট্যান্ডে পরিষেবা দেওয়া কর্মীদের ন্যূনতম খরচ মেটাতেই এই টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি BMS নেতৃত্বের। অর্থাৎ তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি কোনও জোরপূর্বক চাঁদা আদায় নয়, বরং পরিষেবা সংক্রান্ত কর্মীদের খরচ মেটানোর জন্য সংগৃহীত অনুদান। কিন্তু এখানেই আবার সামনে আসছে স্বচ্ছতার প্রশ্ন। কারণ টাকা যদি অনুদান হিসেবেই সংগ্রহ করা হয়, তাহলে সেই অনুদানের রসিদে সংগঠনের নাম থাকবে না কেন? কুপনে শুধু গৈরিক পতাকার ছবি থাকার কারণ কী? টাকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও নিয়ম বা অনুমোদন রয়েছে কি না, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে মনে করছেন অনেকে। একইসঙ্গে পুরসভার তরফে যে প্রবেশ ফি নেওয়া হচ্ছে এবং সংগঠনের নামে যে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, এই দুই অর্থ আদায়ের মধ্যে কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ সাধারণ বাস মালিক বা পরিবহণ কর্মীর কাছে প্রতিটি টাকার হিসাব গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার পাল্টেছে, পাল্টায়নি চাঁদার কারবার ! গেরুয়া কুপনে টাকা তোলা
গুসকরা বাসস্ট্যান্ডে ফের চাঁদার অভিযোগ ! বাসপিছু ৩০ টাকা আদায় ঘিরে প্রশ্ন
একদিকে বাস চালাতে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, কর্মীদের বেতন এবং অন্যান্য খরচ রয়েছে, অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের ফি বা অনুদানের বোঝা বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পরিবহণ ব্যবস্থার উপর পড়তে পারে। আর সেই কারণেই গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের এই ঘটনাকে শুধুমাত্র ৩০ টাকা নেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের পর সংগঠনগুলির ভূমিকা এবং প্রভাবের প্রশ্নও। কারণ আগে যে জায়গায় একটি রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠনের অফিস ছিল, রাজনৈতিক পালাবদলের পর সেখানে অন্য রাজনৈতিক দলের পতাকা দেখা যাচ্ছে। আর সেই সময়েই যদি নতুন করে টাকা সংগ্রহের অভিযোগ ওঠে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—শুধু পতাকার রং বদলেছে, নাকি কাজের ধরনও বদলেছে? রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে তোলাবাজির বিরুদ্ধে যতই কড়া বার্তা দেওয়া হোক, মাঠে সেই বার্তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তবে একইসঙ্গে এটাও মনে রাখা দরকার, অভিযোগ উঠলেই সেটিকে তোলাবাজি বা বেআইনি অর্থ আদায় হিসেবে চূড়ান্তভাবে ধরে নেওয়া যায় না। যদি সত্যিই এটি পরিষেবা দেওয়া কর্মীদের খরচ মেটানোর জন্য সংগৃহীত অনুদান হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থ সংগ্রহের প্রক্রিয়া, অনুমোদন এবং হিসাব প্রকাশ্যে আনা হলে বিতর্কের অনেকটাই অবসান হতে পারে। কিন্তু যদি কোনও সংগঠনের নাম ব্যবহার না করে বা উদ্দেশ্য স্পষ্ট না করে নিয়মিতভাবে টাকা নেওয়া হয়, তাহলে সেই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তাই গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের এই ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে স্বচ্ছতা। কে টাকা নিচ্ছে, কার অনুমতিতে নিচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে নিচ্ছে, কত টাকা সংগ্রহ হচ্ছে এবং সেই টাকার হিসাব কোথায় থাকছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর সামনে আসা দরকার। একইসঙ্গে বাস মালিক ও পরিবহণ কর্মীদের কাছ থেকেও তাঁদের বক্তব্য জানা প্রয়োজন। তাঁরা স্বেচ্ছায় এই টাকা দিচ্ছেন, নাকি কোনও ধরনের চাপ রয়েছে—সেটিও তদন্তের বিষয় হতে পারে। কারণ রাজনৈতিক পতাকা হাতে কোনও সংগঠনের উপস্থিতি থাকলেই সেই সংগঠন বেআইনি কিছু করছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যেমন ঠিক নয়, তেমনই রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কোনও ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে সেটিও উপেক্ষা করা যায় না। ফলে গোটা বিষয়টি নিয়ে প্রশাসন, পুরসভা এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই ধরনের অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ সরকার বদলেছে, ক্ষমতার রং বদলেছে, রাজনৈতিক পতাকার অবস্থান বদলেছে—কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগ যদি একইভাবে ফিরে আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, সত্যিই কি বদলেছে পুরনো সংস্কৃতি? নাকি শুধু পতাকার রং বদলেছে, বদলায়নি সেই চাঁদা তোলার মানসিকতা? গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের ৩০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ এখন সেই প্রশ্নই সামনে এনে দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কড়া বার্তার পরেও যদি পরিবহণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষকে কোনও ধরনের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়, তাহলে তার স্বচ্ছতা এবং বৈধতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া জরুরি। আর যদি সত্যিই এটি সংগঠনের অনুমোদিত অনুদান হয়, তাহলে সেই বিষয়টিও প্রকাশ্যে স্পষ্ট করা দরকার। কারণ বিতর্কের অবসান ঘটানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল স্বচ্ছতা। এখন দেখার, গুসকরা বাসস্ট্যান্ডে ৩০ টাকা করে নেওয়ার এই অভিযোগের প্রকৃত সত্য কী, কোন সংগঠন বা কারা এই অর্থ সংগ্রহ করছে, সেই অর্থের উদ্দেশ্য কী এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয় কি না। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকার বদলালেই শুধু তোলাবাজির অভিযোগ বন্ধ হয় না; মাঠে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, সংগঠনের স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বার্তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করে সেই পরিবর্তনের আসল ছবি। গুসকরা বাসস্ট্যান্ডের ঘটনা তাই শুধু একটি কুপনে ছাপা ৩০ টাকার গল্প নয়, বরং রাজনৈতিক পালাবদলের পর শিল্প, পরিবহণ এবং সংগঠনভিত্তিক অর্থ সংগ্রহের সংস্কৃতি কতটা বদলেছে, সেই বড় প্রশ্নেরই নতুন করে সামনে আসা।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram