This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : বর্ষা এলেই আতঙ্ক বাড়ে কাঁকসার বিদবিহার গ্রাম পঞ্চায়েতের শিবপুরের রায়ডাঙা বাগদিপাড়ায়। বছরের পর বছর কেটে গেলেও পাকা রাস্তা তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে চলাচলের উপযোগী একটি রাস্তারও দেখা নেই এই এলাকায়। ফলে ধানজমির আলই এখন রায়ডাঙা বাগদিপাড়ার বাসিন্দাদের একমাত্র যাতায়াতের পথ। বর্ষা নামলেই সেই জমির আল কাদা-পানিতে পিচ্ছিল হয়ে ওঠে। আর তখনই শুরু হয় এলাকার মানুষের চরম দুর্ভোগ। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তার বদলে ধানজমির আল পরিণত হয় কাদায় ভরা বিপজ্জনক পথে। পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন সেই পথ দিয়েই চলাচল করতে হয় বাসিন্দাদের। বিশেষ করে স্কুলপড়ুয়া, বয়স্ক মানুষ এবং অসুস্থদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের দাবি, বাম আমলে পাট্টার জমিতে গড়ে উঠেছিল এই বসতি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেখানে বাড়ি তৈরি হয়েছে, বেড়েছে পরিবারের সংখ্যা। বর্তমানে বহু পরিবার এই এলাকায় বসবাস করলেও তাঁদের মৌলিক সমস্যার সমাধান হয়নি। সরকার বদলেছে, পঞ্চায়েত বদলেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি রায়ডাঙা বাগদিপাড়ার মানুষের দুর্ভোগ। দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার দাবি জানিয়েও এখনও পর্যন্ত স্থায়ী সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বর্ষাকালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, বাড়ি থেকে বের হওয়াই অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। ধানজমির আল দিয়ে হাঁটার সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কাদা-পানির মধ্যে দিয়ে স্কুলে যেতে হয় এলাকার পড়ুয়াদের। ফলে প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া যেন একপ্রকার লড়াই। স্থানীয় পড়ুয়া অনুষ্কা বাগদির কথায়, কাদার মধ্যে দিয়েই স্কুলে যেতে হয়, তাই ভয় লাগে। শুধু কাদা বা পিচ্ছিল রাস্তার সমস্যাই নয়, বর্ষাকালে এই এলাকায় বাড়ে সাপ-বেঙের আতঙ্কও। ধানজমি এবং ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে অনেক সময় সাপ বা অন্যান্য বিষাক্ত প্রাণীর মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে রাতের দিকে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে দাবি বাসিন্দাদের। রাস্তার আলো বা নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় জরুরি প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দেয় যখন কোনও বাসিন্দা অসুস্থ হয়ে পড়েন। রাস্তার অভাবে অ্যাম্বুল্যান্স এলাকায় ঢুকতে পারে না বলে অভিযোগ। ফলে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে বাড়ি থেকে মূল রাস্তা পর্যন্ত নিয়ে যেতে অনেক সময় পরিবারের সদস্যদেরই কাঁধে বা চ্যাংদোলা করে বহন করতে হয়। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটও যেখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে রাস্তার অভাবে সেই কয়েক মিনিটের পথ পেরোতেই দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। শুধু অসুস্থ রোগী নয়, কোনও বাসিন্দার মৃত্যু হলে মৃতদেহ নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় পরিবারকে। গাড়ি বা অ্যাম্বুল্যান্স সরাসরি বাড়ির কাছে পৌঁছতে না পারায় মৃতদেহও অনেক সময় কাঁধে করে বা চ্যাংদোলায় করে নিয়ে যেতে হয় বলে অভিযোগ।
১৫ বছর ধরে প্রতিশ্রুতিই সার ! বর্ষায় ধানজমির আলই ভরসা রায়ডাঙা বাগদিপাড়ার
ফলে রাস্তার অভাব এখানে শুধুমাত্র যাতায়াতের সমস্যা নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং জরুরি পরিষেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মানসা বাগদির অভিযোগ, প্রায় ১৫ বছর ধরে তাঁরা রাস্তার দাবিতে বারবার প্রশাসন এবং পঞ্চায়েতের কাছে আবেদন জানিয়ে আসছেন। কিন্তু এত বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই মিলেছে, রাস্তা তৈরি হয়নি। ভোটের আগে বিভিন্ন সময়ে রাস্তা তৈরির আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে সেই কাজ আর হয়নি বলে অভিযোগ। তাঁদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ধরে যদি একটি এলাকার মানুষ রাস্তার মতো মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাহলে উন্নয়নের সুফল তাঁরা কোথায় পেলেন? স্থানীয়দের আরও দাবি, বর্ষার সময় তাঁদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি হলেও সমস্যা শুধু বর্ষাকালেই সীমাবদ্ধ নয়। সারা বছরই ধানজমির আল দিয়ে চলাচল করতে হয়। বর্ষায় কাদা-পানি সেই পথকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে, আবার শুষ্ক মরশুমেও সেটি কোনও স্থায়ী রাস্তার বিকল্প হতে পারে না। শিশুদের স্কুলে যাওয়া, বাজারে যাওয়া, কর্মস্থলে যাতায়াত, চিকিৎসার প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া—প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই পথের উপর নির্ভর করতে হয় বাসিন্দাদের। স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য স্বপন সূত্রধরও স্বীকার করেছেন যে এলাকায় এখনও রাস্তা তৈরির কাজ হয়নি। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি নিয়ে নতুন সরকারের কাছে রাস্তা নির্মাণের আবেদন জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা যে রয়েছে, তা পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকেও অস্বীকার করা হচ্ছে না। এখন প্রশ্ন, আবেদন এবং প্রতিশ্রুতির পর বাস্তবে কবে রাস্তা তৈরি হবে? স্থানীয়দের দাবি, তাঁরা আর নতুন করে প্রতিশ্রুতি চান না, চান বাস্তব কাজ। দ্রুত রাস্তার জন্য প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে স্থায়ী রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। বর্ষার আগে রাস্তা তৈরি সম্ভব না হলেও অন্তত এমন একটি অস্থায়ী চলাচলের ব্যবস্থা করা হোক, যাতে মানুষ নিরাপদে বাড়ি থেকে বেরোতে পারেন এবং জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুল্যান্স বা অন্যান্য যানবাহন অন্তত এলাকার কাছাকাছি পৌঁছতে পারে। কারণ একটি রাস্তা শুধুমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম নয়, একটি এলাকার মানুষের সঙ্গে বৃহত্তর সমাজের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। রাস্তা না থাকলে স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, বাজার—সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়তে হয় মানুষকে। রায়ডাঙা বাগদিপাড়ার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও সেই সমস্যাই যেন বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। বর্ষা এলেই কাদা-পানিতে ডুবে যায় তাঁদের একমাত্র যাতায়াতের পথ, বাড়ে সাপ-বেঙের আতঙ্ক, স্কুলপড়ুয়াদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়, আর অসুস্থ রোগী বা মৃতদেহ নিয়ে যেতে গিয়ে পরিবারগুলিকে পড়তে হয় চরম সমস্যায়। তাই এবার আর শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত রাস্তা নির্মাণের দাবি তুলেছেন এলাকার মানুষ। তাঁদের প্রশ্ন, দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে যদি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে? নতুন সরকারের কাছে তাঁদের একটাই আবেদন—রায়ডাঙা বাগদিপাড়ার মানুষের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান ঘটিয়ে দ্রুত একটি স্থায়ী, নিরাপদ এবং চলাচলের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা হোক। এখন দেখার, বছরের পর বছর ধরে চলে আসা এই সমস্যার সমাধানে প্রশাসন ও পঞ্চায়েত কত দ্রুত পদক্ষেপ করে এবং বর্ষার কাদা-পানির রাস্তা কবে পাকা, নিরাপদ ও স্বাভাবিক যাতায়াতের পথে পরিণত হয়।