দুর্গাপুরের ‘রক্তচোষা’ ! গ্রেফতার ৩

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : নাবালক স্কুল পড়ুয়াদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে রক্তদান করানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে শিল্পাঞ্চলে। অভিযোগ, একটি বেসরকারি স্কুলের কয়েকজন নাবালক ছাত্রকে আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় বিধাননগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে তাদের দিয়ে রক্তদান করানো হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এই রক্তদানের বিনিময়ে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়েছে। ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেফতার করেছে দুর্গাপুর থানার পুলিশ। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সদস্য অমিত প্রসাদ যাদব। এছাড়াও গ্রেফতার করা হয়েছে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র দেবপ্রিয় চক্রবর্তী এবং মালদহের বাসিন্দা মহম্মদ হাবিবুল্লাহকে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে অভিযান চালিয়ে তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়। শুক্রবার ধৃতদের দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত দুর্গাপুরের ইস্পাতনগরী এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের কয়েকজন নাবালক পড়ুয়াকে ঘিরে। অভিযোগ, ওই পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের আর্থিক সুবিধার প্রলোভন দেখানো হয়। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বিধাননগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। সেখানে নাবালকদের দিয়ে রক্তদান করানো হয় বলে অভিযোগ। অভিযোগের আরও গুরুতর দিক হল, এই রক্তদানের আগে বা পরে পড়ুয়াদের টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। যদিও রক্তদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কার প্রয়োজনে রক্ত নেওয়া হয়েছিল এবং এর বিনিময়ে কোনও আর্থিক লেনদেন হয়েছে কি না—এই সমস্ত বিষয়ই এখন তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পরেই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। এরপর দুর্গাপুর থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তে নেমে প্রথমেই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র দেবপ্রিয় চক্রবর্তীর নাম সামনে আসে। পুলিশের দাবি, দেবপ্রিয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা স্বীকার করে এবং তদন্তকারীদের সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়। পুলিশের দাবি অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদে দেবপ্রিয় জানায়, তৃণমূল ছাত্র পরিষদের সদস্য অমিত প্রসাদ যাদবের প্ররোচনাতেই সে নাবালক পড়ুয়াদের এই কাজে যুক্ত করেছিল। পুলিশের তদন্তে এরপর আরও একজনের নাম উঠে আসে। তিনি হলেন মহম্মদ হাবিবুল্লাহ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, হাবিবুল্লাহ মালদহের বাসিন্দা এবং বর্তমানে দুর্গাপুরের বিধাননগর এলাকার একটি বেসরকারি হোটেলে কর্মরত। তদন্তকারীদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে তাঁরও যোগসূত্র রয়েছে।
দুর্গাপুরের ‘রক্তচোষা’ ! গ্রেফতার ৩
নাবালকদের রক্তদান করানোর অভিযোগ, দুর্গাপুরে গ্রেফতার ৩

তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই পুলিশের সন্দেহের তালিকায় উঠে আসে অমিত প্রসাদ যাদবের নাম। পুলিশের অভিযোগ, গোটা কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে ছিলেন তিনিই। তাঁর প্ররোচনা এবং পরিকল্পনার ভিত্তিতেই নাবালকদের এই কাজে যুক্ত করা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। এরপর বৃহস্পতিবার রাতে দুর্গাপুর থানার পুলিশ অভিযান চালিয়ে তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর তাদের থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, কতজন নাবালককে এইভাবে রক্তদান করানো হয়েছে, তাদের কীভাবে যোগাযোগ করা হয়েছিল, কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং এর পিছনে আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত চিত্র কী। শুধু তাই নয়, এই ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের নির্দেশে এই কাজ করা হয়েছিল কি না, রক্ত সংগ্রহের পর তা কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে এবং নাবালকদের রক্তদানের বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানত কি না—এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরও খুঁজছেন তদন্তকারীরা। নাবালকদের রক্তদান করানোর অভিযোগ সামনে আসায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, নাবালকদের ক্ষেত্রে রক্তদানের নিয়ম এবং সম্মতির বিষয়টি কীভাবে মানা হয়েছিল। পরিবারের অনুমতি ছাড়া তাদের কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল কি না, অথবা পুরো বিষয়টি তাদের কাছে কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল—সেই বিষয়গুলিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ঘটনায় তৃণমূল ছাত্র পরিষদের এক সদস্যের নাম জড়িয়ে পড়ায় রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে আলোচনা। যদিও রাজনৈতিক পরিচয় কোনও অপরাধ প্রমাণ করে না এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই আইনত নির্দোষ—তবে পুলিশের তদন্তে তাঁর নাম উঠে আসায় বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এদিকে, নাবালকদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে রক্তদান করানোর মতো অভিযোগকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য এখন এই ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র সামনে আনা। এই ঘটনায় কতজন পড়ুয়া জড়িত, তাদের বয়স কত, কারা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং রক্তদানের পর সেই রক্তের কী হয়েছিল—একাধিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে দুর্গাপুর থানার পুলিশ। শুক্রবার ধৃত তিনজনকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। আদালতে পুলিশের তরফে তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের কথা জানানো হয়েছে। এই ঘটনার সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রেখেছে পুলিশ। সব মিলিয়ে, শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরে নাবালক স্কুল পড়ুয়াদের টাকার প্রলোভন দেখিয়ে রক্তদান করানোর অভিযোগ ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য। অভিযোগের সত্যতা কতটা, এই কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে আসলে কারা রয়েছে এবং এর পিছনে কোনও বড় চক্র কাজ করছে কি না—তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত স্পষ্ট নয়। তবে তিনজনের গ্রেফতারের পর তদন্ত কোন দিকে এগোয়, আর এই ঘটনায় আরও কারও নাম সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সকলের। নাবালকদের ব্যবহার করে এমন কোনও কর্মকাণ্ড হয়ে থাকলে তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। আর পুলিশও জানিয়েছে, তদন্তে যে তথ্য উঠে আসছে, তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সমস্ত পদক্ষেপ করা হবে। দুর্গাপুরে নাবালকদের রক্তদান করানোর অভিযোগে তিন গ্রেফতার—এই ঘটনায় তদন্ত যত এগোবে, ততই সামনে আসতে পারে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram