দণ্ডি কেটে বীরভূম থেকে তারকেশ্বরের পথে শ্রীকৃষ্ণ

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : ভক্তি, বিশ্বাস এবং অদম্য মানসিক শক্তির এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তীব্র দাবদাহ, দীর্ঘ পথ, শারীরিক ক্লান্তি— কোনও বাধাই থামাতে পারেনি বীরভূমের যুবক শ্রীকৃষ্ণ পালকে। একমাত্র লক্ষ্য, দণ্ডি কেটে পৌঁছতে হবে বাবা তারকনাথের ধামে। সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই গত ১৭ জুলাই বীরভূম জেলার হযরতপুর গ্রাম থেকে শুরু হয়েছে তাঁর কঠিন ধর্মীয় যাত্রা। প্রায় তিন মাসের এই দীর্ঘ সাধনার পথে রবিবার তিনি পৌঁছলেন দুর্গাপুরের আড়া এলাকায়। আর তাঁর এই ব্যতিক্রমী যাত্রা দেখতে রাস্তার ধারে ভিড় জমালেন বহু মানুষ। সাধারণত শ্রাবণ মাসে বাবা তারকনাথের দর্শনের জন্য হাজার হাজার ভক্ত বিভিন্ন উপায়ে তারকেশ্বরে পৌঁছন। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ কাঁধে কাঁভার নিয়ে, আবার কেউ বিভিন্ন ব্রত পালন করে মন্দিরে যান। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ পালের পথ একেবারেই আলাদা। তিনি বেছে নিয়েছেন দণ্ডি কেটে যাওয়ার কঠিন পথ। প্রতিটি দণ্ডির পর শরীরের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী সামনে এগিয়ে আবার একইভাবে প্রণাম করে এগিয়ে চলা— এইভাবেই চলছে তাঁর যাত্রা। গত ১৭ জুলাই হযরতপুর থেকে যাত্রা শুরুর পর প্রতিদিন নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করছেন তিনি। সঙ্গে রয়েছেন আরও দুই সঙ্গী। তাঁরা শ্রীকৃষ্ণের প্রয়োজনীয় সামগ্রী বহন করছেন, বিশ্রামের ব্যবস্থা করছেন এবং পথ চলায় সহযোগিতা করছেন। তাঁদের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে এই দীর্ঘ ধর্মীয় সাধনা। রবিবার দুপুরে তীব্র রোদের মধ্যেই দণ্ডি কাটতে কাটতে দুর্গাপুরের আড়া এলাকায় পৌঁছন শ্রীকৃষ্ণ পাল। মাথার উপর প্রখর সূর্য, উত্তপ্ত রাস্তা, চারদিকে গরম হাওয়া— সবকিছুকে উপেক্ষা করেই একের পর এক দণ্ডি কেটে এগিয়ে যেতে দেখা যায় তাঁকে। তাঁর এই অদম্য অধ্যবসায় ও ভক্তি দেখে বিস্মিত হয়ে পড়েন পথচলতি মানুষ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা। খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাস্তার দুই পাশে ভিড় জমতে শুরু করে। অনেকেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তাঁর যাত্রা প্রত্যক্ষ করেন। কেউ মোবাইলে সেই দৃশ্য ধারণ করেন, আবার কেউ ভক্তিভরে হাত জোড় করে প্রার্থনা জানান। অনেকেই শ্রীকৃষ্ণের এই কঠিন সাধনাকে ঈশ্বরের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ এগিয়ে এসে মানবিকতার পরিচয় দেন। কেউ তাঁকে ঠান্ডা জল পান করান, কেউ ওআরএস বা শরবতের ব্যবস্থা করেন। অনেকেই কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার অনুরোধ জানান। পথের ক্লান্তি দূর করতে কেউ ছায়ার ব্যবস্থা করেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় খাবার তুলে দেন তাঁর সঙ্গীদের হাতে। অপরিচিত মানুষদের এই আন্তরিক সহযোগিতায় আবেগাপ্লুত হন শ্রীকৃষ্ণ এবং তাঁর সহযাত্রীরা।
দণ্ডি কেটে বীরভূম থেকে তারকেশ্বরের পথে শ্রীকৃষ্ণ
দণ্ডি কেটে তারকেশ্বর যাত্রা, দুর্গাপুরে পৌঁছতেই ভক্তকে ঘিরে মানুষের ভিড়

শ্রীকৃষ্ণ পাল জানান, বহুদিন ধরেই তাঁর মনে ইচ্ছা ছিল দণ্ডি কেটে বাবা তারকনাথের মন্দিরে গিয়ে পুজো দেওয়ার। দীর্ঘদিনের সেই মানত পূরণ করতেই তিনি এই কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর কথায়, “পথ অনেক দীর্ঘ, কষ্টও অনেক। কিন্তু বাবা তারকনাথের আশীর্বাদে সেই কষ্ট অনুভব করছি না। প্রতিটি দণ্ডিই আমার কাছে এক একটি প্রার্থনা।” তিনি আরও জানান, পুরো যাত্রা শেষ করতে প্রায় তিন মাস সময় লাগবে। প্রতিদিন শরীরের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করছেন। কোথাও তাড়াহুড়ো নেই। একমাত্র লক্ষ্য, সুস্থভাবে তারকেশ্বরে পৌঁছে বাবা তারকনাথের চরণে প্রণাম নিবেদন করা। শ্রীকৃষ্ণের দুই সঙ্গীও জানান, এই যাত্রা সহজ নয়। প্রতিদিনই প্রচণ্ড গরম, বৃষ্টি কিংবা রাস্তার প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তবুও শ্রীকৃষ্ণের দৃঢ় মানসিক শক্তি তাঁদেরও অনুপ্রাণিত করছে। তাঁরা সর্বক্ষণ তাঁর পাশে থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করে চলেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, বর্তমান সময়ে এমন নিষ্ঠা ও ভক্তির নজির খুব একটা দেখা যায় না। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনের মাঝেও একজন যুবক নিজের বিশ্বাসকে এতটা গুরুত্ব দিয়ে এই কঠিন ব্রত পালন করছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। অনেকেই বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত বিষয় হলেও এই ধরনের আত্মনিয়োগ মানুষের মানসিক দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ধর্মীয় বিশেষজ্ঞদের মতে, দণ্ডি কাটা শুধু একটি আচার নয়, এটি আত্মসংযম, ত্যাগ এবং ঈশ্বরের প্রতি গভীর আস্থার বহিঃপ্রকাশ। দীর্ঘ পথ জুড়ে শরীরকে কষ্ট দিয়ে ভক্তরা বিশ্বাস করেন, এর মাধ্যমে তাঁরা নিজের মানত পূরণ করেন এবং ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করেন। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এই প্রথার প্রচলন বহুদিনের। দুর্গাপুরের আড়া এলাকায় শ্রীকৃষ্ণের এই যাত্রা প্রত্যক্ষ করে অনেকেই তাঁর জন্য প্রার্থনা করেন। কেউ বলেন, “বাবা তারকনাথ যেন তাঁর মনোবাসনা পূরণ করেন।” আবার কেউ বলেন, “এত কষ্ট সহ্য করে যে ভক্তি নিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন, তা সত্যিই শ্রদ্ধার যোগ্য।” শ্রীকৃষ্ণ পালের এই দীর্ঘ যাত্রা এখন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় ব্রত নয়, বহু মানুষের কাছে তা হয়ে উঠেছে অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং অটুট বিশ্বাসের প্রতীক। প্রতিটি দণ্ডির সঙ্গে তিনি যেন নিজের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করে তুলছেন। সামনে এখনও দীর্ঘ পথ। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, বাবা তারকনাথের কৃপায় সমস্ত বাধা অতিক্রম করে একদিন তিনি পৌঁছে যাবেন তাঁর কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। সব মিলিয়ে, বীরভূম থেকে তারকেশ্বরের উদ্দেশে দণ্ডি কেটে চলা শ্রীকৃষ্ণ পালের এই কঠিন সাধনা আজ বহু মানুষের মনে ভক্তি, শ্রদ্ধা এবং অনুপ্রেরণার সঞ্চার করেছে। দুর্গাপুরের আড়া এলাকায় তাঁর এই যাত্রাপথ যেন স্মরণ করিয়ে দিল— দৃঢ় বিশ্বাস, ধৈর্য এবং আত্মনিবেদন থাকলে কঠিন পথও অতিক্রম করা সম্ভব।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram