This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
আসানসোল : কুলটি থানার নিয়ামতপুর ফাঁড়ি এলাকায় অবৈধ লোহা কাটাই কারখানার বিরুদ্ধে বড়সড় অভিযান চালিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেল পুলিশ। গোপন সূত্রে পাওয়া নির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে রাধানগর এলাকায় হানা দিয়ে বিপুল পরিমাণ ঢালাইয়ের লোহার রড, গ্যাস কাটার মেশিন, ওয়েট মেশিন-সহ লোহা কাটাইয়ের কাজে ব্যবহৃত একাধিক সরঞ্জাম উদ্ধার ও বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে ঘটনাস্থল থেকেই এক কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশের অনুমান, এই কারখানাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ লোহা কাটাইয়ের ব্যবসা চলছিল এবং এর সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত থাকতে পারে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মঙ্গলবার ভোর থেকে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করে নিয়ামতপুর ফাঁড়ির পুলিশ রাধানগরের একটি কারখানায় অভিযান চালায়। অভিযানের সময় কারখানায় ঢুকেই পুলিশ দেখতে পায় সেখানে বিপুল পরিমাণ লোহার সামগ্রী কেটে আলাদা করা হচ্ছে। এরপর গোটা কারখানায় তল্লাশি চালিয়ে প্রায় চার হাজার কেজি ঢালাইয়ের লোহার রড উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি বাজেয়াপ্ত করা হয় একটি গ্যাস কাটার মেশিন, একটি ওয়েট মেশিন এবং লোহা কাটাইয়ের কাজে ব্যবহৃত আরও একাধিক সরঞ্জাম। উদ্ধার হওয়া সমস্ত সামগ্রী পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে এই কারখানাটি বাবলু সাও নামে এক ব্যক্তির। তবে অভিযানের খবর আগেই কোনওভাবে পেয়ে যাওয়ায় পুলিশের পৌঁছানোর আগেই সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। বর্তমানে তার খোঁজে একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে এই অবৈধ কারবারের নেপথ্যে থাকা পুরো চক্র সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসবে। অভিযানের সময় ঘটনাস্থল থেকেই জয় কুমার রবি দাস নামে এক কর্মীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। পরে তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। মঙ্গলবার ধৃতকে আসানসোল জেলা আদালতে তোলা হয়। তদন্তের স্বার্থে তাকে সাত দিনের পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানানো হবে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, ধৃতকে জিজ্ঞাসাবাদ করেই জানা যাবে এই কারখানায় কীভাবে লোহা আসত, কোথা থেকে সংগ্রহ করা হতো, কার নির্দেশে কাটাই করা হতো এবং পরে সেই লোহা কোথায় পাঠানো হতো। পুলিশ এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ লোহার উৎস খুঁজে বের করার দিকে। এই লোহা কোনও বৈধ শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে কেনা হয়েছে, নাকি বিভিন্ন কারখানা, রেল এলাকা বা শিল্পাঞ্চল থেকে চুরি করে এনে এখানে কেটে পাচারের প্রস্তুতি চলছিল, সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুলটির রাধানগরে অবৈধ লোহা কাটাই কারখানায় পুলিশের হানা, ৪ হাজার কেজি রড উদ্ধার, ধৃত ১
তদন্তকারীরা মনে করছেন, শুধুমাত্র একটি ছোট কারখানার মাধ্যমে এত বড় পরিমাণ লোহা সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। এর পিছনে সংগঠিতভাবে কাজ করা একটি বড় নেটওয়ার্ক থাকতে পারে। সেই কারণেই এই মামলায় শুধু একজন কর্মীকে গ্রেপ্তার করেই তদন্ত শেষ করতে চাইছে না পুলিশ। বরং গোটা চক্রের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, সরবরাহকারী, পরিবহণকারী এবং ক্রেতাদেরও চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে একাধিক জায়গায় আরও অভিযান চালানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে পুলিশ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কুলটি-নিয়ামতপুর শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধ লোহার কারবার নিয়ে অভিযোগ উঠছিল। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোহা চুরি, পুরনো যন্ত্রাংশ কেটে বিক্রি এবং অবৈধভাবে লোহার রড ও স্ক্র্যাপ মজুত করার অভিযোগ নতুন নয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, বহুদিন ধরেই রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোহা এনে এই ধরনের কারখানায় কাটাই করে অন্যত্র পাচার করা হয়। তবে এবার পুলিশের এই অভিযানে সেই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশের দাবি, শিল্পাঞ্চলে অবৈধ লোহা পাচার রুখতে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই অভিযান আরও জোরদার করা হবে। তদন্তে উঠে আসা তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনে আরও গ্রেপ্তারির সম্ভাবনাও রয়েছে। তদন্তকারীরা ইতিমধ্যেই উদ্ধার হওয়া লোহার নমুনা, ওজন, প্রকৃতি এবং সম্ভাব্য উৎস নিয়ে বিশদ অনুসন্ধান শুরু করেছেন। পাশাপাশি কারখানার নথিপত্র, জমির মালিকানা, বিদ্যুৎ সংযোগ, ব্যবসায়িক অনুমতি এবং আর্থিক লেনদেনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি দেখা যায় যে কোনও বৈধ লাইসেন্স ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এই কারখানা পরিচালিত হচ্ছিল, তাহলে সংশ্লিষ্ট আইনে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। পুলিশ এ-ও খতিয়ে দেখছে, এই কারখানার সঙ্গে অন্য কোনও অবৈধ স্ক্র্যাপ ব্যবসায়ী বা শিল্পাঞ্চলের চোরাই লোহা পাচারচক্রের যোগ রয়েছে কি না। তদন্তের স্বার্থে আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলছেন তদন্তকারীরা। পুলিশের মতে, মূল অভিযুক্ত বাবলু সাওকে গ্রেপ্তার করা গেলে এই কারবারের আর্থিক লেনদেন, লোহার উৎস এবং সম্ভাব্য পাচারচক্র সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে। ফলে তার খোঁজে একাধিক জায়গায় তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। সব মিলিয়ে, কুলটি-নিয়ামতপুর শিল্পাঞ্চলে অবৈধ লোহা কাটাইয়ের বিরুদ্ধে পুলিশের এই অভিযানকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিপুল পরিমাণ লোহা ও সরঞ্জাম উদ্ধার, এক কর্মীর গ্রেপ্তার এবং মূল অভিযুক্তের খোঁজে তল্লাশি—সব মিলিয়ে এই মামলার তদন্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী দিনে তদন্তে আর কী কী তথ্য সামনে আসে, আরও কেউ গ্রেপ্তার হন কি না এবং এই অবৈধ লোহা কাটাই ও সম্ভাব্য পাচারচক্রের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে পুলিশ কতটা সফল হয়, সেদিকেই নজর রয়েছে প্রশাসন, শিল্পমহল এবং সাধারণ মানুষের।