জলের তোড়ে ভেসে গেল তিনটি বাঁশের সেতু !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
আসানসোল : বার্নপুরের রিভার সাইড এলাকায় দামোদর নদের ওপর নির্মিত তিনটি অস্থায়ী বাঁশের সেতু প্রবল জলের তোড়ে ভেসে যাওয়ায় কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পশ্চিম বর্ধমান ও বাঁকুড়া জেলার একাধিক গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা। টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে দামোদর নদের জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে বুধবার সকালের মধ্যে নদীর স্রোতের তীব্র চাপে একের পর এক ভেসে যায় এই তিনটি অস্থায়ী বাঁশের সেতু। আর তার জেরেই চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ। প্রতিদিন যাঁরা এই সেতু ব্যবহার করে কর্মস্থলে যেতেন, স্কুল-কলেজে পড়তে যেতেন, ব্যবসার কাজে কিংবা চিকিৎসার জন্য নদী পার হতেন, তাঁদের জীবনযাত্রা এক ধাক্কায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এই তিনটি বাঁশের সেতুই ছিল দুই জেলার বহু গ্রামের মানুষের কাছে সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু বর্ষার বাড়তি জলের চাপে মুহূর্তের মধ্যেই সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। বর্তমানে নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে ঈশ্বরদা, কেশরকুড়ি এবং কুঁকড়াকুড়ি ফেরিঘাট। তবে ফেরিঘাটের উপর নির্ভর করেও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরছে না। কারণ নৌকায় পারাপারের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। যাত্রীদের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অন্যদিকে যাঁদের জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছনো দরকার, তাঁদের বাধ্য হয়ে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার ঘুরপথে যাতায়াত করতে হচ্ছে। ফলে সময়ের পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াতের খরচও। কর্মজীবী মানুষদের অনেকেই সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছতে পারছেন না। স্কুল ও কলেজের পড়ুয়াদেরও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বহু ছাত্রছাত্রীকে অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হওয়ায় পড়াশোনায়ও প্রভাব পড়ছে। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া রোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও ভোগান্তি কম নয়। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ, শিশু এবং অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগের। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এটি নতুন কোনও সমস্যা নয়। বর্ষা এলেই প্রায় প্রতি বছর একই দৃশ্য দেখতে হয় তাঁদের। দামোদরের জল বাড়লেই অস্থায়ী বাঁশের সেতুগুলি ভেসে যায়, আর তারপর দিনের পর দিন চরম দুর্ভোগের মধ্যে কাটাতে হয় সাধারণ মানুষকে। প্রশাসনের কাছে বারবার আবেদন জানানো হলেও স্থায়ী কোনও সমাধান এখনও মেলেনি বলে অভিযোগ তাঁদের।
জলের তোড়ে ভেসে গেল তিনটি বাঁশের সেতু !
দামোদরের ভাঙনে বিচ্ছিন্ন দুই জেলা, ফের উঠল পাকা সেতুর দাবি
বহু বছর ধরে এলাকার মানুষ দামোদর নদের ওপর একটি স্থায়ী পাকা সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের বক্তব্য, অস্থায়ী বাঁশের সেতু কখনওই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। প্রতি বছর সেতু ভেসে গেলে আবার নতুন করে বাঁশের সেতু তৈরি করতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনই অর্থও ব্যয় হয়। অথচ একটি স্থায়ী কংক্রিটের সেতু নির্মাণ হলে বছরের বারো মাস নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা বজায় রাখা সম্ভব হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদেরও দাবি, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষকরাও সমস্যায় পড়েছেন। নদীর ওপারের জমিতে চাষের কাজ, ফসল পরিবহণ এবং বাজারে কৃষিপণ্য নিয়ে যেতে চরম অসুবিধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। শুধু তাই নয়, জরুরি পরিষেবার গাড়ি বা অ্যাম্বুল্যান্সও সরাসরি এই পথে চলাচল করতে না পারায় বিপদের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। বুধবার সকাল থেকেই ভেঙে যাওয়া বাঁশের সেতুর অংশ নদী থেকে সরানোর কাজ শুরু হয়েছে। যাতে ফেরিঘাটের নৌকা চলাচলে কোনও বাধা সৃষ্টি না হয়, সেই লক্ষ্যেই প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই কাজ চলছে। তবে নতুন করে অস্থায়ী সেতু নির্মাণে কতদিন সময় লাগবে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি। এই পরিস্থিতিতে দুই জেলার বাসিন্দারা ফের প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের একটাই দাবি, প্রতি বছরের এই দুর্ভোগ থেকে স্থায়ী মুক্তি দিতে অবিলম্বে দামোদর নদের ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্ষা এলেই যদি হাজার হাজার মানুষের স্বাভাবিক জীবন থমকে যায়, তাহলে সেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করাই প্রশাসনের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে কোনও বড় পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। তাই এবার আর সাময়িক সমাধান নয়, দ্রুত একটি স্থায়ী পাকা সেতুর কাজ শুরু করার দাবিতেই সরব হয়েছেন পশ্চিম বর্ধমান ও বাঁকুড়া জেলার মানুষ। এখন দেখার, প্রশাসন এই দাবিকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের পথে এগোয়, নাকি আগামী বর্ষাতেও একইভাবে বাঁশের সেতু ভেসে গিয়ে আবারও দুর্ভোগের মুখে পড়তে হবে হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram