This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
শিলিগুড়ি : প্রকৃতির রূপ কখন যে রুদ্ররূপ ধারণ করবে, তা অনেক সময় বোঝার সুযোগই থাকে না। আর সেই বাস্তব অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন দুই যুবক ও দুই যুবতী। মঙ্গলবার গভীর রাতে দুধিয়ার বালাসন নদীতে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করতেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পরিস্থিতি। টানা ভারী বৃষ্টির জেরে আগে থেকেই ফুলেফেঁপে উঠেছিল বালাসন নদী। পাহাড়ি এলাকায় অবিরাম বৃষ্টির ফলে নদীর জলস্তর ক্রমশ বাড়ছিল। তবুও সেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতেই নদীর বুকে গাড়ি নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে যান চারজন। প্রথমদিকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই আচমকা নদীর স্রোত বেড়ে যায়। নদীর বুকে জল বাড়তে শুরু করে দ্রুতগতিতে। এরপর প্রবল স্রোতের মধ্যে গাড়িটি মাঝনদীতেই আটকে পড়ে। গাড়ির চাকা বালির মধ্যে বসে যায় বলে জানা গিয়েছে। চারদিক দিয়ে বাড়তে থাকে জল। মুহূর্তের মধ্যেই গাড়ির চারপাশে তীব্র স্রোত তৈরি হয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে প্রাণ বাঁচানোর একমাত্র উপায় হিসেবে গাড়ির ছাদে উঠে আশ্রয় নেন চার আরোহী। রাতের অন্ধকার। চারদিকে শুধু নদীর গর্জন আর প্রবল স্রোত। যে কোনও মুহূর্তে আরও বড় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারত। এই অবস্থায় স্থানীয়দের নজরে আসে নদীর মাঝখানে আটকে থাকা গাড়িটি। খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় ভিড় জমতে শুরু করে। তবে নদীর স্রোত এতটাই প্রবল ছিল যে সহজে উদ্ধার অভিযান চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। ঠিক সেই সময় সামনে আসেন এক স্থানীয় যুবক। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তিনি উদ্ধার অভিযানে নামেন। একটি লম্বা দড়ি নিয়ে নদীর জলে নেমে পড়েন তিনি। প্রথমদিকে প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজে সমস্যা তৈরি হয়। একাধিকবার ভারসাম্য হারানোর উপক্রম হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। ধীরে ধীরে দড়ির সাহায্যে আটকে পড়া চারজনের কাছে পৌঁছে যান। এরপর একে একে প্রত্যেককে নিরাপদে নদীর পাড়ে নিয়ে আসেন। চারজনকেই অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরে স্থানীয়দের সহযোগিতায় নদীর মাঝখান থেকে গাড়িটিও উদ্ধার করা হয়।
দুঃসাহসিক উদ্ধার অভিযান ! বালাসন নদীর মাঝখান থেকে উদ্ধার ৪ জন
ঘটনার পর এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, আবহাওয়া দফতর আগেই ভারী বৃষ্টি এবং নদীর জলস্তর বৃদ্ধির সতর্কতা জারি করেছিল। তারপরও গভীর রাতে নদীর মধ্যে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করা অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন সিদ্ধান্ত। তাঁদের দাবি, সামান্য ভুলেই বড়সড় প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারত। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি নদীর জলস্তর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যেতে পারে। উজানে ভারী বৃষ্টি হলে তার প্রভাব কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাটির দিকে পৌঁছে যায়। তাই বর্ষাকালে নদীর চর, শুকনো নদীর খাত কিংবা নদীর মাঝখানে গাড়ি নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে উত্তরবঙ্গ জুড়ে টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তা, তোর্সা, মহানন্দা, জলঢাকা এবং বালাসন-সহ একাধিক নদীর জলস্তর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসের ঘটনাও ঘটেছে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে। নদীর ধারে অযথা ভিড় না করা, জলস্রোতের কাছে না যাওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রবেশ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবুও বারবার দেখা যাচ্ছে, অনেকেই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে নিজেদের ফেলে দিচ্ছেন। এই ঘটনাও সেই প্রশ্নই তুলে দিল। যদি স্থানীয় ওই যুবক সময়মতো সাহসিকতার পরিচয় না দিতেন, তাহলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াত, তা সহজেই অনুমেয়। স্থানীয় মানুষ তাঁর এই মানবিক উদ্যোগ এবং অসাধারণ সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, তাঁর দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং উপস্থিত বুদ্ধির কারণেই চারটি প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। এই ঘটনা শুধু একটি উদ্ধার অভিযানের গল্প নয়। এটি বর্ষাকালে নদী ও পাহাড়ি এলাকায় নিরাপত্তা বিধি মেনে চলারও একটি বড় শিক্ষা। প্রশাসনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে কিংবা রোমাঞ্চের খোঁজে নদীর বুকে গাড়ি নিয়ে প্রবেশ কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তারই বাস্তব উদাহরণ এই ঘটনা। সৌভাগ্যবশত, এদিন কোনও প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু এই অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে চার আরোহীর জীবনে এক ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে থাকবে। আর সকলের কাছেই এই বার্তা রেখে গেল—প্রকৃতির সঙ্গে কখনও ঝুঁকি নিয়ে লড়াই নয়, বরং সতর্কতাই হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।