বরাকরে ১০২ বছরের ব্যতিক্রমী জগন্নাথের স্নানযাত্রা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
আসানসোল : ভক্তি, বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর ধর্মীয় আবেগ—এই চারটি শব্দই যেন একসূত্রে বেঁধে দিল বরাকরের শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মন্দির ও মা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারা মন্দিরকে। প্রায় ১০২ বছরের পুরনো এই মন্দিরে প্রতিবছরের মতো এবারও অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হল জগন্নাথদেবের ব্যতিক্রমী স্নানযাত্রা উৎসব। ভোর থেকেই মন্দির চত্বরে দেখা যায় ভক্তদের দীর্ঘ লাইন। কেউ এসেছেন আসানসোল থেকে, কেউ দুর্গাপুর, কেউ বা পুরুলিয়া কিংবা কলকাতা থেকে। আবার ঝাড়খণ্ডের ধানবাদ, নিরসা, চিরকুন্ডা-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকেও অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী উপস্থিত হন এই বিরল অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করতে। সারাদিন ধরে ভক্তিমূলক কীর্তন, শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টা-ঘড়ার শব্দ এবং “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা মন্দির চত্বর। এই মন্দিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল—এখানে শুধু জগন্নাথদেব নন, মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য, রাধাকৃষ্ণ, মা অন্নপূর্ণা-সহ একাধিক দেব-দেবীর নিত্য পূজা ও ভোগ নিবেদন হয়ে থাকে। মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শাস্ত্রমতে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পর সাধারণত ১৫ দিনের জন্য মন্দিরের দরজা বন্ধ রাখা হয়। এই সময়কে বলা হয় ‘অনবাসর’ বা ‘অনসর’। বিশ্বাস করা হয়, মহাস্নানের পর জগন্নাথদেব অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বিশ্রামে থাকেন। কিন্তু বরাকরের এই ঐতিহ্যবাহী মন্দিরে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রথা। বহু বছর আগে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ও আধ্যাত্মিক গুরু সীতারাম বাবার নির্দেশে এমন একটি ব্যবস্থা চালু করা হয়, যাতে জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রার পরেও অন্যান্য দেব-দেবীর নিত্যসেবা, পূজা ও ভোগে কোনও বিঘ্ন না ঘটে। সেই থেকেই এই ব্যতিক্রমী রীতি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছে মন্দির কর্তৃপক্ষ।
বরাকরে ১০২ বছরের ব্যতিক্রমী জগন্নাথের স্নানযাত্রা
বরাকরে ব্যতিক্রমী জগন্নাথ স্নানযাত্রা ! ১০২ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী হাজারো ভক্ত

এদিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল জগন্নাথদেবের মহাস্নান। শাস্ত্রবিধি মেনে জগন্নাথদেবকে ১২০ প্রকার পবিত্র দ্রব্য দিয়ে মহাস্নান করানো হয়। সাত সমুদ্রের জল, বিভিন্ন তীর্থক্ষেত্র থেকে সংগৃহীত পবিত্র মৃত্তিকা, পঞ্চদ্রব্য, ঘি, মধু, চন্দন, সুগন্ধি জল এবং আরও বহু ধর্মীয় উপাচারে সম্পন্ন হয় এই বিশেষ স্নানযজ্ঞ। বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ, পুরোহিতদের আচার-অনুষ্ঠান এবং ভক্তদের নামসংকীর্তনের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণ হয় এই মহাস্নান। স্নানযাত্রার এই আচার শুধু ধর্মীয় রীতি নয়, ভক্তদের কাছে এটি আত্মশুদ্ধি, ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ এবং আধ্যাত্মিক শান্তির এক বিশেষ উপলক্ষ। স্নানপর্ব শেষ হতেই শুরু হয়ে যায় আগামী রথযাত্রার প্রস্তুতি। মন্দির প্রাঙ্গণে ইতিমধ্যেই সাজানো হয়েছে রথ। শুরু হয়েছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আগামী রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই উৎসাহে মেতে উঠেছেন ভক্তরা। মন্দিরের সেবাইত হরেকৃষ্ণ বাবা জানান, এবারের উৎসব আগের তুলনায় আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়েছে। কারণ, এই প্রথম রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক অনুদান পাওয়ায় উৎসবের পরিকাঠামো আরও উন্নত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি বলেন, ভক্তদের আন্তরিক সহযোগিতা এবং সরকারি সহায়তার ফলে শতবর্ষেরও বেশি পুরনো এই ঐতিহ্যকে আরও সুন্দরভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। উৎসবে আগত বহু ভক্ত জানান, প্রতিবছরই তাঁরা এই স্নানযাত্রায় অংশ নেন। তাঁদের মতে, বরাকরের এই জগন্নাথ মন্দিরের স্নানযাত্রা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি তাঁদের পারিবারিক ঐতিহ্য, বিশ্বাস এবং আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এখানে এসে জগন্নাথদেবের দর্শন করলে মনোবাসনা পূর্ণ হয় এবং জীবনে শান্তি ফিরে আসে। মন্দির কমিটির সদস্যদের দাবি, শতাব্দীপ্রাচীন এই ঐতিহ্যকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। প্রতি বছর উৎসবকে আরও সুসংগঠিত ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সুরক্ষা ব্যবস্থা, ভক্তদের পানীয় জল, প্রসাদ বিতরণ, চিকিৎসা পরিষেবা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে স্বেচ্ছাসেবকরাও দিনভর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সব মিলিয়ে ধর্মীয় আচার, ঐতিহ্য, ভক্তি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয় বরাকরের এই ঐতিহাসিক স্নানযাত্রা উৎসব। প্রায় ১০২ বছরের পুরনো এই বিরল প্রথা আজও সমান মর্যাদায় বহন করে চলেছে শ্রীশ্রী গৌরাঙ্গ মন্দির ও মা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারা মন্দির। হাজার হাজার ভক্তের উপস্থিতি আবারও প্রমাণ করে দিল, সময়ের পরিবর্তন হলেও মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি এবং ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা আজও অটুট। আগামী রথযাত্রার অপেক্ষায় এখন গোটা বরাকর, আর সেই উৎসবকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে নতুন করে আনন্দ আর উৎসবের আবহ।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram