সর্বমঙ্গলা মন্দিরে 'চুরি', ভাঙা ৪টি প্রণামী বাক্স !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
পূর্ব বর্ধমান : পুজোর মরশুমের আগে বর্ধমান শহরের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থানে দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। শহর বর্ধমানের প্রসিদ্ধ মা সর্বমঙ্গলা মন্দিরে গভীর রাতে নিরাপত্তা ভেঙে ঢুকে দুষ্কৃতীরা একাধিক প্রণামী বাক্স ভেঙে নগদ অর্থ লুট করে পালিয়ে যায়। মঙ্গলবার সকালে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই ভক্ত, স্থানীয় বাসিন্দা এবং মন্দির কর্তৃপক্ষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে মন্দিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও উঠতে শুরু করেছে একাধিক প্রশ্ন। মঙ্গলবার ভোরে প্রতিদিনের মতো নিত্যপুজোর প্রস্তুতির জন্য মন্দিরে আসেন কর্মীরা। সেই সময়ই প্রথম তাঁদের নজরে আসে অস্বাভাবিক একটি দৃশ্য। মন্দিরের পশ্চিম দিকের মেদ্যা পুকুর সংলগ্ন প্রবেশপথের গেটের তালা ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিষয়টি দেখে সন্দেহ হওয়ায় তাঁরা দ্রুত মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করেন। এরপর দেখা যায়, প্রবেশপথে থাকা দুটি কাঁচের প্রণামী বাক্স-সহ মোট চারটি প্রণামী বাক্সের তালা ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং বাক্সগুলির ভিতরে থাকা সমস্ত নগদ অর্থ উধাও। ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তেই মন্দির চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করেন ভক্তরা। সকালের পুজো দিতে আসা বহু মানুষ এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক মন্দিরে কীভাবে এমন দুঃসাহসিক চুরির ঘটনা ঘটতে পারে? ভক্তদের একাংশের দাবি, ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য নিরাপত্তা আরও জোরদার করা জরুরি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বর্ধমান সদর থানার পুলিশ। গোটা এলাকা ঘিরে তদন্ত শুরু করেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। মন্দিরের বিভিন্ন অংশ খতিয়ে দেখা হয় এবং ভাঙা তালা, প্রণামী বাক্সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করা হয়। ফরেনসিক তদন্তের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। মন্দির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঘটনাটি অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হয়েছে। দুষ্কৃতীরা এমন একটি সময়কে বেছে নিয়েছিল, যখন মন্দিরে মানুষের আনাগোনা একেবারেই কম ছিল। প্রাথমিক অনুমান, গভীর রাত দেড়টা থেকে দু’টোর মধ্যেই চুরির ঘটনাটি ঘটেছে। সর্বমঙ্গলা ট্রাস্ট বোর্ডের সম্পাদক সঞ্জয় ঘোষ জানান, মন্দির প্রাঙ্গণে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ইতিমধ্যেই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফুটেজে কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির গতিবিধি ধরা পড়েছে বলে দাবি তাঁর। সেই ভিডিও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে এই ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলেই আশা করছেন তিনি।
সর্বমঙ্গলা মন্দিরে 'চুরি', ভাঙা ৪টি প্রণামী বাক্স !
ঐতিহ্যবাহী মা সর্বমঙ্গলা মন্দিরে চোরের হানা ! নিরাপত্তা নিয়ে উঠল বড় প্রশ্ন

ট্রাস্ট বোর্ডের লাইফ মেম্বার তথা বিশিষ্ট চিকিৎসক শ্যামলেন্দু চ্যাটার্জিও জানান, চুরির ঘটনাটি গভীর রাতেই ঘটেছে বলে মনে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মন্দিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও এখন নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে। শুধু সিসিটিভি থাকলেই হবে না, প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী, আধুনিক অ্যালার্ম ব্যবস্থা এবং রাতের টহল আরও বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার ক্যামেরার ভিডিওও সংগ্রহ করা হচ্ছে। দুষ্কৃতীরা কোন দিক দিয়ে এসেছে এবং কোন পথে পালিয়েছে, তা জানার চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তিগত তথ্য, মোবাইল টাওয়ার লোকেশন এবং অন্যান্য সূত্র মিলিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে। তদন্তকারীদের মতে, এই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে। কারণ, অল্প সময়ের মধ্যে চারটি প্রণামী বাক্স ভেঙে নগদ অর্থ নিয়ে পালানো একজনের পক্ষে সহজ নয়। ফলে এটি একটি পরিকল্পিত চক্রের কাজ হতে পারে বলেই মনে করছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই কয়েকজন সন্দেহভাজনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাঁদের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি শুরু হয়েছে। মা সর্বমঙ্গলা মন্দির শুধু বর্ধমানের নয়, গোটা রাজ্যের অন্যতম পরিচিত শক্তিপীঠ হিসেবে বিবেচিত। প্রতিদিন অসংখ্য ভক্ত এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন। বিশেষ করে দুর্গাপুজো, কালীপুজো এবং অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের সময় হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়। সেই কারণে প্রণামী বাক্সে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা পড়ে। ফলে এই ধরনের মন্দিরকে লক্ষ্য করে অপরাধীরা সক্রিয় হতে পারে বলেই মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চুরি ও ভাঙচুরের ঘটনা বেড়েছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলিতে নিরাপত্তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। শুধু সিসিটিভি ক্যামেরা নয়, নিয়মিত পুলিশি টহল, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা এবং আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করার দাবি তুলেছেন তাঁরা। পুলিশের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, তদন্তে কোনও খামতি রাখা হবে না। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে খুব দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে তদন্তকারীরা আশাবাদী। পাশাপাশি লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের চেষ্টাও চলছে। ঘটনার পরও মন্দিরে নিত্যপুজো এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যথারীতি সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিরাপত্তা নিয়ে ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ স্পষ্ট। অনেকেই মনে করছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনের নয়, সমাজেরও দায়িত্ব। সব মিলিয়ে, বর্ধমানের ঐতিহ্যবাহী মা সর্বমঙ্গলা মন্দিরে এই দুঃসাহসিক চুরির ঘটনায় শহরজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। চারটি প্রণামী বাক্স ভেঙে নগদ অর্থ লুটের ঘটনায় তদন্তে নেমেছে পুলিশ। এখন নজর একটাই—সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রযুক্তিগত তথ্যের সাহায্যে কত দ্রুত অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা যায় এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য কী ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram