রাজ্যের বড় সিদ্ধান্ত, ভেঙ্গে দেওয়া হল আসানসোল পুরনিগম

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
আসানসোল : দীর্ঘদিনের জল্পনা, বিতর্ক এবং প্রশাসনিক অচলাবস্থার পর অবশেষে বড় সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার। আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হল আসানসোল পুরনিগমের পুরবোর্ড। ৭ জুলাই জারি হওয়া সরকারি নির্দেশে জানানো হয়েছে, নতুন নির্বাচিত বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত অথবা সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য পুরনিগমের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাবেন IAS অফিসার অদিতি চৌধুরী। এই সিদ্ধান্তের ফলে আপাতত পুরনিগমের সমস্ত প্রশাসনিক, আর্থিক এবং নীতিগত ক্ষমতা প্রশাসকের হাতেই ন্যস্ত থাকবে। নাগরিক পরিষেবা, উন্নয়নমূলক প্রকল্প, দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ এবং জরুরি পরিষেবা যাতে কোনওভাবেই ব্যাহত না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি রাজ্য সরকারের। গত কয়েক মাস ধরেই আসানসোল পুরনিগমকে ঘিরে একের পর এক বিতর্ক সামনে আসে। অভিযোগ ওঠে, দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত বোর্ড মিটিং অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ফলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে। এর পাশাপাশি সম্পত্তি কর মকুবকে কেন্দ্র করে বিতর্ক, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বিলম্ব এবং একাধিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে আসে। এই পরিস্থিতিতে পুর ও নগরোন্নয়ন দপ্তরের পক্ষ থেকে আসানসোল পুরনিগমকে শো-কজ নোটিশ পাঠানো হয়। সেই নোটিশে প্রশাসনিক কার্যকলাপ, বোর্ড পরিচালনা, আর্থিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিক পরিষেবা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছিল বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়। প্রাক্তন মেয়র বিধান উপাধ্যায় সেই নোটিশের জবাবে ই-মেইলের মাধ্যমে প্রায় ছয় পাতার একটি বিস্তারিত উত্তর পাঠান। সেখানে পুরবোর্ডের অবস্থান, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয় বলে জানা গেছে। তবে প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, সেই জবাবে সরকার সন্তুষ্ট হয়নি। সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখার পরই পুরবোর্ড ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী, প্রশাসক অদিতি চৌধুরী নতুন নির্বাচিত বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত অথবা সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। এই সময়ের মধ্যে পুরনিগমের সমস্ত পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজ্যের বড় সিদ্ধান্ত, ভেঙ্গে দেওয়া হল আসানসোল পুরনিগম
শো-কজের পর কড়া পদক্ষেপ ! ভেঙে দেওয়া হল আসানসোল পুরবোর্ড

এদিকে, এই সিদ্ধান্তের পর প্রাক্তন মেয়র বিধান উপাধ্যায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, পুরবোর্ড ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে আগে থেকে তাঁর কাছে কোনও সরকারি তথ্য ছিল না। তিনি জানান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচিত বোর্ডকে এভাবে ভেঙে দেওয়া উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে তিনি নতুন প্রশাসককে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং আশা প্রকাশ করেছেন যে, তাঁর নেতৃত্বে আসানসোলের নাগরিকরা আরও উন্নত পরিষেবা পাবেন এবং চলমান উন্নয়নমূলক কাজের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। অন্যদিকে, এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বিরোধী দল বিজেপি। বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বহু কাউন্সিলর সাধারণ মানুষের সমস্যার প্রতি উদাসীন ছিলেন। এলাকার বহু নাগরিক নিকাশি, পানীয় জল, রাস্তা, কর সংক্রান্ত সমস্যা এবং অন্যান্য পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলেন। তাঁর দাবি, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণেই সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। তাই রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত যথার্থ এবং অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। রাজনৈতিক মহলের মতে, আসানসোলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলের পুর প্রশাসনে এই পরিবর্তন আগামী দিনে প্রশাসনিক কার্যকলাপ এবং রাজনৈতিক সমীকরণ—দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশাসক নিয়োগের পর এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে নাগরিক পরিষেবা আরও গতিশীল করা, জমে থাকা প্রশাসনিক ফাইল নিষ্পত্তি করা, উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলিকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশাসক হিসেবে কাজ করার সময় স্বচ্ছতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নাগরিক সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে পুরনিগম নির্বাচন কবে হবে, সেই দিকেও নজর থাকবে রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের। বর্তমানে সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী, নতুন নির্বাচিত বোর্ড দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রশাসকই পুরনিগম পরিচালনা করবেন। ফলে আগামী কয়েক মাস আসানসোল পুরনিগমের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণভাবে প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে চলবে। আসানসোলের নাগরিকদের প্রত্যাশা, প্রশাসনিক পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে এবং পুর পরিষেবার মান আরও উন্নত হবে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram