হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ! শ্রীনগরপল্লীতে মরণফাঁদ বিশাল জলাধার

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : শ্রীনগরপল্লীর ২০ নম্বর ওয়ার্ড । প্রতিদিন এই এলাকার শত শত মানুষ এক অদৃশ্য আতঙ্ককে সঙ্গী করেই দিন কাটাচ্ছেন। কারণ, তাদের মাথার ঠিক ওপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে দুর্গাপুর নগর নিগমের তৈরি একটি বিশালাকার জলাধার, যা স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী এখন কার্যত মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। বাইরে থেকে নীল-সাদা রঙে সাজানো থাকলেও, সেই রঙের প্রলেপের নিচে লুকিয়ে রয়েছে জরাজীর্ণ, ভঙ্গুর এবং বিপজ্জনক এক কাঠামো। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জলাধারটির পিলারে একাধিক বড় ফাটল স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, প্রায়শই উপরের অংশ থেকে কংক্রিটের চাঙড় খসে পড়ছে। সেই ভাঙা অংশ কখনও বাড়ির ছাদে, কখনও রাস্তার উপর এসে পড়ছে। সৌভাগ্যক্রমে এখনও পর্যন্ত বড় কোনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু এলাকাবাসীর প্রশ্ন, প্রতিদিন যখন এই বিপজ্জনক কাঠামোর নিচ দিয়ে শিশু, বৃদ্ধ, মহিলা-সহ অসংখ্য মানুষ যাতায়াত করছেন, তখন বড় দুর্ঘটনা ঘটতে আর কতক্ষণ ? বাসিন্দাদের আরও দাবি, জলাধারটি একদিকে হেলে রয়েছে। সেই কারণেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে। কারণ, যদি কোনওদিন এই বিশাল জলাধারটি ভেঙে পড়ে, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা। বহু মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। সেই ভয় নিয়েই প্রতিদিন ঘুম ভাঙছে, আবার সেই ভয় নিয়েই রাত কাটছে শ্রীনগরপল্লীর মানুষের। এই সমস্যা কিন্তু নতুন নয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু বছর ধরেই এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির কথা প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছে। তাঁদের দাবি, বামফ্রন্ট সরকারের আমলে যখন জলাধারটি নির্মাণ করা হচ্ছিল, তখনই এলাকাবাসী আপত্তি জানিয়েছিলেন। জনবহুল আবাসিক এলাকায় এত বড় জলাধার নির্মাণ না করে কোনও ফাঁকা জায়গায় তৈরির আবেদন করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেই সময় তাঁদের দাবি গুরুত্ব পায়নি। এরপর ২০১১ সালে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরও নতুন করে আশার আলো দেখেছিলেন স্থানীয়রা। তাঁরা লিখিতভাবে তৎকালীন পুর কর্তৃপক্ষ এবং শাসকদলের নেতৃত্বের কাছে জলাধারের সংস্কারের আবেদন জানান। অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই আবেদন কার্যকর হয়নি। বরং সংস্কারের পরিবর্তে জলাধারের বাইরের অংশে নীল-সাদা রঙের প্রলেপ দিয়ে তার জীর্ণ অবস্থা ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে বাহ্যিক সৌন্দর্য বাড়লেও ভিতরের দুর্বল কাঠামো আগের মতোই থেকে গেছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শুধুমাত্র রঙ করে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করা হয়েছে। অথচ কাঠামোগত পরীক্ষা, মেরামত কিংবা পুনর্নির্মাণের মতো কোনও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মানুষের উদ্বেগ।
হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা ! শ্রীনগরপল্লীতে মরণফাঁদ বিশাল জলাধার
দুর্গাপুরে বিপজ্জনক জলাধার ! প্রশাসনের উদাসীনতায় ঝুঁকিতে শত শত প্রাণ

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের অভিযোগ, জলাধারের সংস্কারের নামে প্রকৃত কাজ না করে শুধু সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে। তাঁদের দাবি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার কথা না ভেবে দুর্নীতির মাধ্যমে কাটমানির রাজনীতি করা হয়েছে। বিজেপির অভিযোগ, মানুষের জীবন নিয়ে উদাসীন থেকেছে শাসকদল। অন্যদিকে, এই অভিযোগের বিষয়ে শাসকদলের কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে রাজনৈতিক বিতর্ক চললেও সাধারণ মানুষের মূল উদ্বেগ একটাই—জীবন ও নিরাপত্তা। প্রশ্ন উঠছে, এত বড় একটি জনবহুল এলাকায় অবস্থিত জলাধারের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা স্ট্রাকচারাল অডিট আদৌ হয়েছে কি? যদি হয়ে থাকে, তাহলে তার রিপোর্ট কী বলছে? আর যদি না হয়ে থাকে, তাহলে কেন এতদিন ধরে এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ কাঠামোকে অবহেলায় ফেলে রাখা হয়েছে ? বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরনো কংক্রিটের জলাধারে ফাটল, লোহার রডে মরচে, কংক্রিট খসে পড়া কিংবা কাঠামো হেলে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত প্রযুক্তিগত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। প্রয়োজন হলে জলাধারটি ব্যবহার বন্ধ করে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করাও জরুরি। কারণ, এমন কাঠামো ভেঙে পড়লে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে। এলাকার মানুষ জানাচ্ছেন, প্রতিদিন তাঁদের সন্তানরা এই জলাধারের পাশ দিয়ে স্কুলে যায়। কর্মজীবীরা যাতায়াত করেন। বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা হাঁটাচলা করেন। অথচ প্রত্যেকের মনেই একটাই ভয়—কখন না আবার মাথার ওপর থেকে কংক্রিটের টুকরো খসে পড়ে, কিংবা কোনওদিন পুরো জলাধারটিই ভেঙে পড়ে। বাসিন্দাদের দাবি, আর আশ্বাস নয়, এবার চাই বাস্তব পদক্ষেপ। অবিলম্বে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে জলাধারের পূর্ণাঙ্গ স্ট্রাকচারাল অডিট করাতে হবে। যদি সেটি বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে দ্রুত মেরামত অথবা ভেঙে নতুন জলাধার নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কাজ চলাকালীন এলাকার মানুষের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি তুলেছেন তাঁরা। আজ রাজনৈতিক দোষারোপের ঊর্ধ্বে উঠে শ্রীনগরপল্লীর মানুষের একটাই আবেদন—তাঁদের নিরাপদে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করা হোক। কারণ, কোনও দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তদন্ত, ক্ষতিপূরণ কিংবা দায় নির্ধারণে মানুষের হারানো জীবন আর ফিরে আসবে না। এখন দেখার বিষয়, দুর্গাপুর নগর নিগম এবং প্রশাসন এই অভিযোগকে কতটা গুরুত্ব দেয়। মানুষের আশঙ্কা দূর করতে দ্রুত কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হবে, নাকি কোনও বড় বিপর্যয়ের পরেই কর্তৃপক্ষের টনক নড়বে? সেই প্রশ্নের উত্তরই এখন খুঁজছে শ্রীনগরপল্লীর শত শত পরিবার।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram