This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : চাকরির নামে প্রতারণার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শুক্রবার ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি হয় ইস্পাত নগরী দুর্গাপুরে। দুর্গাপুরের চৈতন্য এভিনিউ এলাকায় অবস্থিত তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের একটি কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। অভিযোগ, বিভিন্ন শিল্প কারখানায় অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বহু বেকার যুবক-যুবতীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হলেও, তাঁদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত চাকরি পাননি। সেই অভিযোগকে ঘিরেই এদিন ক্ষোভে ফেটে পড়েন প্রতারিতদের একাংশ। পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিক্ষোভে সামিল হন বিজেপি কর্মী-সমর্থকরাও। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে চৈতন্য এভিনিউ এলাকায় অবস্থিত তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের দুর্গাপুর ইস্পাত কারখানা মজদুর ইউনিয়নের কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বহু বেকার যুবক-যুবতী শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন কারখানায় কাজের আশায় বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। অভিযোগ, তাঁদের বলা হয়েছিল নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে চাকরি নিশ্চিত করা হবে। অনেকেই ভবিষ্যতের আশায় ধারদেনা করে কিংবা সঞ্চিত অর্থ তুলে সেই টাকা দিয়েছিলেন। কিন্তু মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর কেটে গেলেও চাকরি মেলেনি বলে অভিযোগ। অভিযোগ আরও, চাকরির বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করা হলেও বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। কখনও বলা হয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে, কখনও আবার নতুন তালিকা প্রকাশের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত চাকরি না পেয়ে এবং টাকা ফেরত না পাওয়ায় প্রতারিতদের ক্ষোভ চরমে ওঠে। শুক্রবার সেই ক্ষোভই বিস্ফোরণের রূপ নেয়। সকালের পর থেকেই কয়েকজন অভিযোগকারী কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। তাঁরা দাবি করেন, যাঁদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে তাঁদের অবিলম্বে চাকরি দিতে হবে অথবা সম্পূর্ণ অর্থ সুদ-সহ ফেরত দিতে হবে। ধীরে ধীরে আরও মানুষ সেখানে জড়ো হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতেই বিক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এর কিছুক্ষণ পর বিজেপি কর্মী-সমর্থকরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তাঁদের অভিযোগ, ওই শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয় থেকেই দীর্ঘদিন ধরে চাকরির নামে অর্থ সংগ্রহ এবং নানা ধরনের অনিয়ম চলছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এতদিন কেউ মুখ খুলতে পারেননি বলেও দাবি করেন বিজেপি নেতৃত্ব। বিক্ষোভ চলাকালীন উত্তেজিত জনতার একাংশ শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর চালায় বলে অভিযোগ।
চাকরি না পেয়ে ক্ষোভের বিস্ফোরণ, তৃণমূল শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ
কার্যালয়ের আসবাবপত্র, দরজা-জানলা এবং বিভিন্ন সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘটনায় এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়। খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মোতায়েন করা হয় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। ঘটনার পর বিজেপি নেত্রী সুমনা ভট্টাচার্য বলেন, “চাকরির নামে বহু বেকার যুবক-যুবতীর কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে। মানুষ তাঁদের শেষ সম্বল পর্যন্ত বিক্রি করে চাকরির আশায় টাকা দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি তো দূরের কথা, টাকাও ফেরত পাননি। আমরা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিচ্ছি, যাঁরা প্রতারিত হয়েছেন তাঁদের হয় অবিলম্বে চাকরি দিতে হবে, নয়তো তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া প্রতিটি টাকা ফেরত দিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই ধরনের কাজ চলেছে বলে অভিযোগ। মানুষ এতদিন ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি। এখন মানুষ নিজের অধিকার বুঝতে শিখেছেন। ভবিষ্যতে যাতে আর কোনও বেকার যুবক-যুবতী চাকরির নামে প্রতারণার শিকার না হন, তার জন্য প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ করতে হবে।” অন্যদিকে, এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন তৃণমূল নেতা কল্লোল ঘোষ। তিনি বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে ভাঙচুর কোনওভাবেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হতে পারে না। যদি কারও কোনও অভিযোগ থাকে, তাহলে আইনের পথে তার সমাধান হওয়া উচিত। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।” তিনি আরও জানান, এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে পুলিশ প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হবে। পাশাপাশি দলীয় স্তরেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার প্রতিবাদে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি। তবে চাকরির নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে কল্লোল ঘোষ সরাসরি কোনও মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে অভিযোগকারীদের দাবি, প্রশাসনের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আসা উচিত। যাঁরা দোষী, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি তুলেছেন তাঁরা। ঘটনার পর গোটা চৈতন্য এভিনিউ এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে প্রশাসন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে চাকরির নামে অর্থ আদায়, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বেকারদের দুর্দশা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের পরই পরিষ্কার হবে কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এদিনের ঘটনায় এক বিষয় স্পষ্ট—চাকরির আশায় টাকা দিয়ে প্রতারিত হওয়ার অভিযোগে ক্ষোভ এখন আর সীমাবদ্ধ নেই; তা রাস্তায় নেমে প্রকাশ্যে বিস্ফোরিত হতে শুরু করেছে। এখন সকলের নজর পুলিশি তদন্তের দিকে। অভিযোগের ভিত্তিতে কী তথ্য উঠে আসে, প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয় এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগের সুরাহা হয় কি না, সেটাই দেখার।