শান্তিপুরের যুবকের হাতে বিশ্বজয় মিনিয়েচার প্রতিমার

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
নদিয়া : শিল্প কখনও শুধু পেশা নয়, অনেকের কাছে তা জীবনের পরিচয়। নদিয়ার শান্তিপুরের সূত্রাগড় তামলিপাড়ার বাসিন্দা সামন্ত হাজরার জীবনও যেন সেই কথারই জীবন্ত উদাহরণ। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই ক্ষুদ্রাকৃতি প্রতিমা নির্মাণে তিনি গড়ে তুলেছেন এক স্বতন্ত্র পরিচয়। অথচ এই পথচলার শুরু হয়েছিল একেবারে শৈশবে। বাড়িতে মা যখন রুটি বানানোর জন্য আটা মাখতেন, সেই আটার ছোট ছোট অংশ নিয়ে খেলতে খেলতেই সামন্ত তৈরি করতেন পশুপাখি কিংবা ছোট ছোট মূর্তি। তখন হয়তো কেউ ভাবেননি, সেই শিশুর খেলাই একদিন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দরজা খুলে দেবে। সামন্তের শিল্পী হয়ে ওঠার পিছনে নেই কোনও আর্ট কলেজ, নেই কোনও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ। নিজের কৌতূহল, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, নিরলস অনুশীলন এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তিকেই পুঁজি করে তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন নিজের শিল্পসত্তা। তবে এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। খুব অল্প বয়সেই বাবাকে হারান সামন্ত। পরিবারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। অসুস্থ মা এবং ছোট ভাইকে নিয়ে সংসার চালানোর কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও তিনি হার মানেননি। সংসারের হাল ধরতে পৈতৃক পাওয়ারলুমের কাজ করেছেন। দিনের পর দিন কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি চালিয়ে গিয়েছেন পড়াশোনাও। সমস্ত প্রতিকূলতাকে জয় করে ২০২১ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। স্নাতক হওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এবার সম্পূর্ণভাবে মন দেবেন নিজের সবচেয়ে প্রিয় কাজ—প্রতিমা নির্মাণে। আর তারপর থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। সামন্ত হাজরার শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, তিনি কোনও ছাঁচ ব্যবহার করেন না। সম্পূর্ণ সলিড মাটি দিয়ে নিজের হাতে গড়ে তোলেন প্রতিটি প্রতিমা। প্রতিটি ভাঁজ, প্রতিটি অলঙ্কার, শাড়ির সূক্ষ্ম নকশা, চুলের বিন্যাস কিংবা মুখের অভিব্যক্তি—সবটাই তৈরি হয় তাঁর নিখুঁত হাতের ছোঁয়ায়।
শান্তিপুরের যুবকের হাতে বিশ্বজয় মিনিয়েচার প্রতিমার
ক্ষুদ্র প্রতিমায় বড় সাফল্য, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি সামন্ত হাজরার

ক্ষুদ্রাকৃতি হলেও তাঁর প্রতিমাগুলির সূক্ষ্মতা এবং বাস্তবধর্মিতা যে কাউকেই মুগ্ধ করে। একটি ছোট প্রতিমা তৈরি করতে কখনও কয়েক দিন, আবার কখনও লেগে যায় টানা এক মাস। প্রতিটি কাজে ধৈর্য, মনোযোগ এবং নিষ্ঠার ছাপ স্পষ্ট। সামন্তের এই শিল্প আজ আর শুধু শান্তিপুর বা নদিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে তাঁর তৈরি ক্ষুদ্রাকৃতি প্রতিমা পৌঁছে গিয়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে। শুধু দেশেই নয়, আমেরিকা, দুবাই-সহ একাধিক দেশ থেকেও এসেছে প্রশংসা এবং অর্ডার। বাংলার ঐতিহ্যবাহী প্রতিমা শিল্পকে তিনি পৌঁছে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে। তাঁর কাজ দেখে অনেকেই বিস্মিত হন, এত ছোট আকারের প্রতিমায় কীভাবে এত সূক্ষ্ম কারুকাজ সম্ভব! সম্প্রতি সামন্ত তৈরি করেছেন প্রায় ২২ ইঞ্চি উচ্চতার একটি জগদ্ধাত্রী প্রতিমা, যার সঙ্গে রয়েছে অত্যন্ত নিখুঁত চালচিত্র। এই প্রতিমাটি বিমানে করে পাঠানো হচ্ছে উত্তরপ্রদেশের বেনারসে। প্রায় এক মাস ধরে অক্লান্ত পরিশ্রমের পর সম্পূর্ণ হয়েছে এই শিল্পকর্ম। শুধুমাত্র একটি প্রতিমা নয়, এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং শিল্পকলার অসাধারণ বহিঃপ্রকাশ। সামন্তের বিশ্বাস, শিল্পের কোনও সীমানা নেই। যদি কাজের মধ্যে নিষ্ঠা এবং ভালোবাসা থাকে, তাহলে সেই শিল্প একদিন না একদিন নিজের জায়গা করে নেবেই। আজ তাঁর এই সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, গর্বের বিষয় গোটা শান্তিপুর, নদিয়া এবং বাংলার জন্যও। যে ছেলে একদিন মায়ের মেখে রাখা আটা দিয়ে খেলতে খেলতে শিল্পের প্রথম পাঠ নিয়েছিল, আজ সেই যুবকের হাতের নিপুণ সৃষ্টি বিমানে চেপে পাড়ি দিচ্ছে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এমনকি বিদেশেও। সামন্ত হাজরার এই সাফল্য প্রমাণ করে, প্রতিভা যদি অধ্যবসায়ের সঙ্গে হাত মেলায়, তবে সীমিত সুযোগও অসীম সম্ভাবনার জন্ম দিতে পারে। অসংখ্য তরুণ-তরুণীর কাছে তাঁর জীবন এক অনুপ্রেরণা। কারণ, বড় স্বপ্ন দেখার জন্য বড় শহর বা বড় প্রতিষ্ঠান নয়, প্রয়োজন শুধুমাত্র নিজের প্রতি বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং সৃজনশীলতার প্রতি অটুট ভালোবাসা।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram