দুর্গাপুর 'গণধর্ষণ' কান্ডে ধৃতদের আদালতে পেশ, 'এনকাউন্টার' নিদান বিজেপি বিধায়কের !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : শিল্পাঞ্চলে নাবালিকা ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া চার অভিযুক্তকে সোমবার দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে পেশ করে পুলিশ। আদালত চত্বরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ দেখান বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। এই আবহেই দুর্গাপুর পূর্বের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধীদের একমাত্র শাস্তি হওয়া উচিত ‘এনকাউন্টার’। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুরের কবিগুরু এলাকার একটি বেসরকারি হোটেলে অষ্টম শ্রেণির এক নাবালিকা ছাত্রীর উপর গণধর্ষণের অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগ অনুযায়ী, নাবালিকাকে মদের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে খাওয়ানো হয়। এরপর সে অচৈতন্য হয়ে পড়লে তার উপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই দুর্গাপুর জুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্তে নামে দুর্গাপুর থানার পুলিশ। তদন্তের ভিত্তিতে পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন নির্যাতিতার এক বান্ধবীও। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের নাম সিমরান তামাং, আজহারউদ্দিন মল্লিক, সুবীর দাস এবং রাজকুমার দে। রাজকুমার দে সংশ্লিষ্ট হোটেলের ম্যানেজার বলে জানা গিয়েছে। পুলিশি তদন্তে উঠে আসা তথ্য এবং অভিযোগের ভিত্তিতে চারজনকেই সোমবার দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। অভিযুক্তদের আদালতে আনা হলে আদালত চত্বরে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা আদালত চত্বরে জড়ো হয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। তাঁদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড এবং স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেই কারণে আদালত চত্বরে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী। দুর্গাপুর থানার পুলিশ কর্মীদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরও মোতায়েন করা হয়। আদালত চত্বরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয় এবং অভিযুক্তদের নিরাপত্তার মধ্যেই আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। এদিন আদালতে উপস্থিত ছিলেন দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রথমেই এই ঘটনায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য পুলিশের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, অভিযোগ সামনে আসার পর পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছে, যা প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
দুর্গাপুর 'গণধর্ষণ' কান্ডে ধৃতদের আদালতে পেশ, 'এনকাউন্টার' নিদান বিজেপি বিধায়কের !
গণধর্ষণ মামলায় তোলপাড় দুর্গাপুর, আদালতে বিজেপির বিক্ষোভ

তবে এরপরই তিনি আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে বলেন, সমাজে এ ধরনের অপরাধীদের কোনও স্থান নেই। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অপরাধ করার সাহস না পায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “এই ধরনের আসামিদের যাদের সকালে জমা নিচ্ছেন, তাদের বিকেলে খরচ করে দিন।” তিনি আরও বলেন, “এই ধরনের অপরাধীদের একটাই শাস্তি হওয়া উচিত, এনকাউন্টার করে মেরে দেওয়া।” বিধায়কের এই মন্তব্যকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতে অপরাধের বিচার আদালতের মাধ্যমে হয় এবং শাস্তি নির্ধারণের একমাত্র অধিকার বিচারব্যবস্থার। ফলে কোনও অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতের রায়ের আগে তাকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা বা বিচারবহির্ভূত শাস্তির দাবি নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এদিন বিধায়ক সংশ্লিষ্ট হোটেলের মালিকের ভূমিকাও খতিয়ে দেখার দাবি জানান। তাঁর অভিযোগ, যে হোটেলে এই ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেই হোটেলের মালিক ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, শুধুমাত্র ম্যানেজারকে গ্রেফতার করলেই দায় শেষ হয়ে যায় না। ঘটনার সঙ্গে যদি হোটেল কর্তৃপক্ষের অন্য কোনও সদস্যের যোগসূত্র থাকে, তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে। নির্যাতিতার বয়ান, চিকিৎসা সংক্রান্ত রিপোর্ট, হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর। তদন্তকারীরা জানতে চেষ্টা করছেন, ঘটনার আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি কী ছিল এবং এই ঘটনার সঙ্গে আর কেউ জড়িত রয়েছে কি না। ঘটনাটি সামনে আসার পর দুর্গাপুর শহরে ক্ষোভের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, মহিলা সংগঠন এবং সাধারণ নাগরিকরা দোষীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অনেকেই বলছেন, নাবালিকাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও কঠোর হতে হবে এবং এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। বর্তমানে ধৃত চারজনই পুলিশি হেফাজতে রয়েছে। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী তদন্তের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। তদন্তে নতুন কোনও তথ্য উঠে আসে কি না, সেদিকেও নজর রয়েছে সকলের। দুর্গাপুরের বহুল আলোচিত এই ঘটনায় একদিকে যেমন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দোষীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জোরালো হচ্ছে। এখন তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে দুর্গাপুরবাসী।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram