তোলাবাজি-সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেফতার প্রাক্তন বোরো চেয়ারম্যান রমাপ্রসাদ

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই আদালতে পেশ করা হলো দুর্গাপুর পুরনিগমের প্রাক্তন কাউন্সিলর তথা প্রাক্তন বোরো চেয়ারম্যান রমাপ্রসাদ হালদারকে। তোলাবাজি, সন্ত্রাস, ভোট পরবর্তী হিংসা এবং আর্থিক অনিয়মের একাধিক অভিযোগে গ্রেফতার হওয়ার পর বৃহস্পতিবার তাঁকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। আর সেই সময় আদালত চত্বরে তৈরি হয় ব্যাপক উত্তেজনা ও চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। জানা গিয়েছে, সকাল থেকেই আদালত চত্বর এবং তার আশপাশের এলাকায় মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদেরও মোতায়েন করা হয় নিরাপত্তার স্বার্থে। কারণ, অভিযুক্তকে আদালতে আনা নিয়ে যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আগেই আশঙ্কা করেছিল প্রশাসন। সেই কারণেই আদালত চত্বরকে কার্যত নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলা হয়। এদিন রমাপ্রসাদ হালদারকে আদালতে আনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আদালত চত্বরে ভিড় জমাতে শুরু করেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকরা। বিশেষ করে বিজেপির বহু কর্মী ও সমর্থক আদালতের সামনে উপস্থিত হন। তাঁদের হাতে ছিল বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড এবং স্লোগান লেখা ব্যানার। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবিতে সরব হতে দেখা যায় তাঁদের। ধৃত তৃণমূল নেতাকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার সময় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের একাংশ বিক্ষোভে সামিল হন। তাঁরা পুলিশকে ঘিরে ধরে বিভিন্ন স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি কিছুক্ষণের জন্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। আদালতের নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে যাতে কেউ অভিযুক্তের কাছে পৌঁছতে না পারে, সেদিকেও কড়া নজর রাখা হয়। বিজেপি কর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার চালানো হয়েছে। তোলাবাজি, জমি দখল, ভয় দেখানো, রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং ভোট পরবর্তী হিংসার সঙ্গে অভিযুক্তের নাম জড়িয়ে রয়েছে বলে দাবি তাঁদের। বিজেপির অভিযোগ, এতদিন প্রশাসনিক মদতের কারণেই অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পরেই প্রকৃত তদন্ত শুরু হয়েছে বলে দাবি গেরুয়া শিবিরের। আদালত চত্বরে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে বিজেপি নেতৃত্বের একাংশ অভিযোগ করেন, “পুলিশ আজ বজ্রআঁটুনি দিয়ে একটি চোরকে ঢাকার চেষ্টা করছে। সাধারণ মানুষের টাকা লুট, তোলাবাজি এবং বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। আমরা চাই সমস্ত ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হোক।”
তোলাবাজি-সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেফতার প্রাক্তন বোরো চেয়ারম্যান রমাপ্রসাদ
ধৃত রমাপ্রসাদকে দেখে ক্ষোভ, আদালতে বিজেপির বিক্ষোভ

বিজেপির আরও দাবি, শুধুমাত্র পুলিশি তদন্তে সীমাবদ্ধ না রেখে গোটা ঘটনার তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিতে হবে। কারণ তাঁদের মতে, আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির যে অভিযোগ সামনে এসেছে, তার গভীরতা অনেক বেশি। সেক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য সিবিআই তদন্তই একমাত্র পথ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরেই রমাপ্রসাদ হালদারের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ জমা পড়ছিল। অভিযোগ ছিল, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ভোটারদের প্রভাবিত করা, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের মারধর করা এবং তোলাবাজির মতো কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িত ছিলেন। শুধু নির্বাচনের আগে নয়, ভোট পরবর্তী সময়েও এলাকায় সন্ত্রাস ও দখলদারির রাজনীতি চালানোর অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি আর্থিক দুর্নীতি সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগও তদন্তকারীদের নজরে আসে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই গ্রেফতারি ঘিরে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে। কারণ অভিযুক্ত রমাপ্রসাদ হালদার দীর্ঘদিন ধরে দুর্গাপুরের রাজনীতিতে একটি পরিচিত মুখ। পুরনিগমের কাউন্সিলর এবং বোরো চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। পুলিশ সূত্রে খবর, রমাপ্রসাদ হালদারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত চলছিল। সেই তদন্তের অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারীরা অভিযোগগুলির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন নথি ও তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখছেন। পাশাপাশি আরও কিছু ব্যক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আদালতে পেশ করার পর তদন্তের স্বার্থে অভিযুক্তকে নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানায় পুলিশ। কারণ এই মামলার সঙ্গে জড়িত আরও তথ্য সংগ্রহ, আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই এবং অন্যান্য অভিযুক্তদের সম্ভাব্য যোগসূত্র খুঁজে বের করার প্রয়োজন রয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। অন্যদিকে আদালত চত্বরে উপস্থিত সাধারণ মানুষের একাংশও গোটা ঘটনাকে ঘিরে কৌতূহল প্রকাশ করেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় নানা অভিযোগের কথা শোনা গেলেও এবার আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তার নিষ্পত্তি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন অনেকে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুরের রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। একদিকে তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরের গ্রেফতারি, অন্যদিকে আদালত চত্বরে বিজেপির বিক্ষোভ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে শিল্পাঞ্চলে। আগামী দিনে তদন্ত কোন দিকে এগোয়, আদালতের পর্যবেক্ষণ কী হয় এবং এই মামলায় আরও নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, এখন সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের। ফিলহাল কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই আদালতের সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই গ্রেফতারিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক তরজা আগামী দিনেও অব্যাহত থাকবে, তা বলাই বাহুল্য। দুর্গাপুরের বহুল চর্চিত এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিকেই এখন তাকিয়ে সকলেই।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram