গরমের ছুটি শেষে স্কুলে ফিরেই ‘বন্দে মাতরম’

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপুর : দীর্ঘ গরমের ছুটির অবসান। প্রায় দেড় মাস পর সোমবার থেকে ফের চেনা ছন্দে ফিরল রাজ্যের স্কুল ও মাদ্রাসাগুলি। নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই কার্যকর হল রাজ্য সরকারের নতুন নির্দেশিকা। সেই নির্দেশ অনুসারে, প্রতিদিনের প্রার্থনা পর্বে বাধ্যতামূলকভাবে গাওয়া হবে দেশাত্মবোধক সংগীত ‘বন্দে মাতরম’। সোমবার ছুটির পর প্রথম দিনেই রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে এই কর্মসূচি পালিত হয় যথাযোগ্য মর্যাদার সঙ্গে। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং শিক্ষাকর্মীদের সমবেত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘বন্দে মাতরম’। দুর্গাপুরের নেপালি পাড়া হিন্দি উচ্চ বিদ্যালয়-সহ শহরের একাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকাল থেকেই ছিল উৎসবের আবহ। গরমের দীর্ঘ বিরতির পর সহপাঠীদের সঙ্গে দেখা হওয়ার আনন্দ যেমন ছিল পড়ুয়াদের চোখেমুখে, তেমনই নতুন নিয়ম অনুযায়ী বিদ্যালয়ের প্রার্থনা সভায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের পাঠক্রম। সোমবার সকালেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায় ছাত্রছাত্রীরা। শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং অশিক্ষক কর্মীরাও উপস্থিত হন প্রার্থনা সভায়। এরপর জাতীয় চেতনা ও দেশপ্রেমের বার্তা বহনকারী ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সূচনা হয় নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনের কার্যক্রম। বিদ্যালয় চত্বরে একসঙ্গে শতাধিক কণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া এই সংগীতের আবহে তৈরি হয় এক বিশেষ পরিবেশ। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, শুধুমাত্র একটি গান গাওয়াই নয়, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় চেতনা, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলাই মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষকদের একাংশ জানান, বর্তমান প্রজন্মকে দেশের ইতিহাস ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে পরিচিত করানোর ক্ষেত্রে এই ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। দুর্গাপুরের বিভিন্ন প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়েও একই ছবি দেখা যায়। সকালবেলা স্কুলে প্রবেশের পর নির্ধারিত সময়ে বিদ্যালয়ের মাঠ বা প্রার্থনা মঞ্চে একত্রিত হয় পড়ুয়ারা। এরপর সমবেত কণ্ঠে গাওয়া হয় ‘বন্দে মাতরম’। অনেক বিদ্যালয়ে সংগীত পরিবেশনের আগে বা পরে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন শিক্ষকরা। সেখানে তুলে ধরা হয় এই সংগীতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে এর ভূমিকা।
গরমের ছুটি শেষে স্কুলে ফিরেই ‘বন্দে মাতরম’
স্কুল খুলতেই বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতরম’

ইতিহাসবিদদের মতে, ‘বন্দে মাতরম’ শুধুমাত্র একটি গান নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত এই গান পরবর্তীকালে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুখে মুখে শোনা যেত এই গান। তাই নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন শিক্ষাবিদদের একাংশ। পড়ুয়াদের মধ্যেও এই উদ্যোগ নিয়ে উৎসাহ লক্ষ্য করা গেছে। অনেকেই জানান, স্কুলে ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে আবার একসঙ্গে প্রার্থনা করতে পেরে তারা আনন্দিত। কেউ কেউ বলেন, ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার সময় এক ধরনের গর্ব অনুভব হয়েছে। দেশের প্রতি ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধার অনুভূতি আরও গভীর হয়েছে বলেও জানিয়েছে বেশ কয়েকজন ছাত্রছাত্রী। অভিভাবকদের একাংশও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, শিক্ষার পাশাপাশি মূল্যবোধের শিক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয়ে যদি ছোটবেলা থেকেই দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে সমাজের উপর। তাই বিদ্যালয়ের প্রার্থনা পর্বে দেশাত্মবোধক সংগীত অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তকে অনেকেই ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে, বিদ্যালয়গুলিতে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে পাঠদানও শুরু হয়েছে পুরোদমে। গরমের ছুটির পর প্রথম দিন হওয়ায় অনেক স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের স্বাগত জানাতে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। কোথাও ফুল দিয়ে অভ্যর্থনা, কোথাও আবার পরিচ্ছন্ন ও সজ্জিত শ্রেণিকক্ষের মাধ্যমে পড়ুয়াদের বরণ করে নেওয়া হয়। নতুন বই, নতুন ক্লাস এবং নতুন লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছে শিক্ষার্থীদের আরেকটি শিক্ষাবর্ষ। শিক্ষা দপ্তরের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী দিনেও প্রতিদিনের প্রার্থনা সভায় ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশন করা হবে। ফলে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী নিয়মিত এই দেশাত্মবোধক সংগীতের মাধ্যমে দিন শুরু করবে। শিক্ষামহলের মতে, এর ফলে একদিকে যেমন বিদ্যালয়ের প্রার্থনা পর্ব আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে, তেমনই জাতীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং দেশপ্রেমের মূল্যবোধও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও সুদৃঢ় হবে। সব মিলিয়ে, গরমের দীর্ঘ ছুটির পর স্কুলে ফেরা এবং নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজ্যের শিক্ষাঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল। শিক্ষার পাশাপাশি মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনার বার্তা ছড়িয়ে দিতে এই উদ্যোগ কতটা সফল হয়, এখন সেদিকেই নজর শিক্ষা মহল থেকে অভিভাবক সকলের।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram