বকরি ঈদে মায়াপুর ইসকনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী
নদিয়া : বকরি ঈদের দিন রাজ্যের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে নতুন করে চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল মায়াপুর ইসকন। এদিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মায়াপুর ইসকন মন্দিরে এসে বিশেষ পূজো ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে অংশ নেন। হেলিকপ্টারে করে মায়াপুরে পৌঁছনোর পর থেকেই প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয় জোর আলোচনা। কারণ, একদিকে যখন গোটা রাজ্যে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বকরি ঈদ উদযাপনে ব্যস্ত, ঠিক সেই দিনই মায়াপুর ইসকনে এসে গোমাতা পুজো দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সূত্রের খবর, হেলিপ্যাডে নামার পর মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই সরাসরি চলে যান মায়াপুর ইসকনের গোষালায়। সেখানে ইসকনের মহারাজ ও সন্ন্যাসীদের উপস্থিতিতে বিশেষ যজ্ঞের আয়োজন করা হয়। ধর্মীয় রীতি মেনে সেই যজ্ঞে অংশ নেন শুভেন্দু অধিকারী। পরে গোষালার ভেতরে থাকা একাধিক গো মাতাকে নিজে হাতে পুজো দেন তিনি। শুধু তাই নয়, গো মাতাদের প্রসাদও খাওয়াতে দেখা যায় মুখ্যমন্ত্রীকে। পুরো অনুষ্ঠান ঘিরে ইসকন চত্বরে তৈরি হয় ভক্তিমূলক পরিবেশ। এরপর কিছু সময় গোষালা কক্ষে কাটান মুখ্যমন্ত্রী। সেখানে ইসকনের মহারাজদের সঙ্গে সৌজন্য বিনিময় করেন এবং প্রসাদ গ্রহণ করেন। ইসকন সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে আগে থেকেই বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। নিরাপত্তার দিক থেকেও কড়া ব্যবস্থা করা হয়। গোটা মায়াপুর এলাকায় মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম মায়াপুর ইসকনে এলেন শুভেন্দু অধিকারী। আর সেই সফর ঘিরেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা। কারণ, এদিন ছিল পবিত্র বকরি ঈদ। দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই দিনে বিভিন্ন ঈদের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা গিয়েছে। কখনও কলকাতার রেড রোডে ঈদের নামাজের অনুষ্ঠানে, কখনও বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সভায় উপস্থিত থেকেছেন তিনি। এমনকি অতীতে তাঁকে নামাজ পড়তেও দেখা গিয়েছে।

সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এই কর্মসূচিকে রাজনৈতিক মহল বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই দেখছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুখে কিছু না বললেও বকরি ঈদের দিন মায়াপুর ইসকনে এসে গোমাতা পুজো দেওয়ার মধ্যে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আবহে এই কর্মসূচি যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন অনেকে। তবে এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী নিজে অবশ্য কোনও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দিতে চাননি। ইসকনের কর্মসূচি শেষ করে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হলে শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এখানে আসেননি। শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণেই মায়াপুরে এসেছেন এবং পূজো দিয়েছেন। তাই এই সফর নিয়ে তিনি কোনও রাজনৈতিক মন্তব্য করতে চান না বলেও জানান। গোষালার কর্মসূচি শেষ করার পর মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি চলে যান মায়াপুর ইসকনের মূল মন্দির, অর্থাৎ চন্দ্রদয় মন্দিরে। সেখানে তিনি রাধামাধব বিগ্রহের দর্শন করেন। মন্দিরের ভেতরে কিছু সময় ধরে পূজো ও আরতিতে অংশ নেন। পরে রাধামাধবকে প্রণাম করে ইসকনের মহারাজদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। মন্দির চত্বরে সেই সময় বহু ভক্ত ও দর্শনার্থীর ভিড় লক্ষ্য করা যায়। মুখ্যমন্ত্রীর সফর ঘিরে সকাল থেকেই মায়াপুর এলাকায় ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রশাসনের তরফে একাধিক রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ইসকনের ভেতরেও ছিল বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশের ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারীর এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজাও শুরু হয়েছে বিভিন্ন মহলে। বিরোধীদের একাংশের মতে, বকরি ঈদের দিন ইসকনে গিয়ে গোমাতা পুজো দেওয়ার মধ্যে রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট। যদিও শাসক শিবিরের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসেবে নিজের ধর্মীয় আচার পালন করেছেন, এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলার রাজনীতিতে ধর্মীয় প্রতীক এবং সাংস্কৃতিক বার্তার ব্যবহার নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে বকরি ঈদের দিন মুখ্যমন্ত্রীর এই কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি রাজনৈতিক গুরুত্ব পেয়ে গিয়েছে। এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে ইসকনের ভক্তদের মধ্যেও উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই মুখ্যমন্ত্রীকে একঝলক দেখার জন্য সকাল থেকেই মন্দির চত্বরে অপেক্ষা করছিলেন। ইসকনের তরফে মুখ্যমন্ত্রীকে বিশেষ সম্মানও জানানো হয়। সব মিলিয়ে বকরি ঈদের দিনে মায়াপুর ইসকনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সফর শুধুমাত্র ধর্মীয় কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা ঘিরে রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক স্তরেও ব্যাপক চর্চা শুরু হয়েছে। আগামী দিনে এই সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে আরও আলোচনা বাড়বে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
