দুর্গাপুরে তৃণমূল নেতা গ্রেফতার, আদালত চত্বরে ‘চোর চোর’ স্লোগান

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram

দুর্গাপুর : রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের আবহে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠল শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুর। এলাকায় সন্ত্রাস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, তোলা আদায় এবং বিজেপি কর্মীদের উপর অত্যাচারের অভিযোগে গ্রেফতার হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের এক প্রভাবশালী ব্লক সভাপতি। বুধবার গভীর রাত থেকে বৃহস্পতিবার আদালত চত্বর পর্যন্ত টানটান উত্তেজনার সাক্ষী থাকল দুর্গাপুর। ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে শাসক ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত নেতার নাম রাজিব ঘোষ। তিনি দুর্গাপুর ১ নম্বর ব্লক তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি এবং দুর্গাপুর পৌরনিগমের প্রাক্তন কাউন্সিলর। অভিযোগ, বুধবার গভীর রাতে ইস্পাত নগরীর তানসেন এলাকায় গোপনে একটি বৈঠক করতে যান তিনি। সেই খবর কোনওভাবে পৌঁছে যায় স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব ও কর্মীদের কাছে। এরপর রাত বাড়তেই তানসেন এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। স্থানীয় সূত্রে খবর, রাজিব ঘোষ সেখানে পৌঁছতেই তাঁকে ঘিরে ফেলেন বিজেপি কর্মীরা। শুরু হয় বিক্ষোভ ও তুমুল উত্তেজনা। পরিস্থিতি ক্রমশ অশান্ত হয়ে উঠতে থাকলে খবর দেওয়া হয় দুর্গাপুর থানায়। পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পুলিশ রাজিব ঘোষকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় এবং দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি নেতৃত্ব তৃণমূলের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এনেছে। বিজেপির দাবি, দীর্ঘদিন ধরেই রাজিব ঘোষের বিরুদ্ধে এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো, বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর হামলা, তোলা আদায় এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর মতো অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর বহু বিজেপি কর্মী ও সমর্থক ঘরছাড়া হয়েছিলেন বলেও অভিযোগ তোলে গেরুয়া শিবির। দুর্গাপুর ১ নম্বর মণ্ডলের বিজেপির সাধারণ সম্পাদক দিব্যেন্দু গায়েন বলেন, “ভোট পরবর্তী সময়ে এলাকায় বিজেপি কর্মীদের উপর ব্যাপক অত্যাচার চালানো হয়েছে। বহু মানুষকে মারধর, হুমকি দিয়ে এলাকা ছাড়া করা হয়েছে। সেই সমস্ত ঘটনায় রাজিব ঘোষের নাম উঠে এসেছে। এখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করতেই তিনি বিজেপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বিজেপিতে এ ধরনের মানুষের কোনও জায়গা নেই। আমরা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি এবং পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছে।” বুধবার রাতের এই ঘটনার পর থেকেই দুর্গাপুরের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বৃহস্পতিবার সকালে ধৃত তৃণমূল নেতাকে দুর্গাপুর মহকুমা আদালতে পেশ করা হয়। আর সেখানেই ফের উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। আদালত চত্বরে সকাল থেকেই জড়ো হয়েছিলেন বিজেপির বহু কর্মী-সমর্থক। পুলিশের কড়া নিরাপত্তার মধ্যেই রাজিব ঘোষকে আদালতে আনা হয়।

দুর্গাপুরে তৃণমূল নেতা গ্রেফতার, আদালত চত্বরে ‘চোর চোর’ স্লোগান
সন্ত্রাসের অভিযোগে গ্রেফতার রাজিব ঘোষ, উত্তপ্ত দুর্গাপুর আদালত চত্বর

তবে আদালতের গেটের সামনে পৌঁছতেই বিজেপি কর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। রাজিব ঘোষকে লক্ষ্য করে ‘চোর চোর’, ‘সন্ত্রাসের জবাব চাই’, ‘চোরকে শাস্তি দাও’ সহ একাধিক স্লোগান দিতে শুরু করেন তাঁরা। অনেকেই জুতো দেখিয়ে প্রতিবাদ জানান। মুহূর্তের মধ্যে আদালত চত্বর কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও সতর্ক অবস্থায় রাখা হয় বলে সূত্রের খবর। বিক্ষোভ এতটাই তীব্র হয়ে ওঠে যে রাজিব ঘোষকে আদালতের ভেতরে নিয়ে যেতে পুলিশকে কার্যত মানব প্রাচীর তৈরি করতে হয়। পুলিশের একাধিক আধিকারিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আদালত চত্বরের বাইরে সাধারণ মানুষের ভিড়ও চোখে পড়ে। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এই ঘটনায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়। জেলা বিজেপির মুখপাত্র সুমন্ত মন্ডল এই প্রসঙ্গে বলেন, “তৃণমূলের এই ব্লক সভাপতি দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে ভয় দেখিয়েছে। গরিব মানুষের টাকা লুট করেছে। নির্বাচনের আগে এবং পরে এলাকায় হিংসা ছড়িয়েছে। এমন মানুষদের কোমরে দড়ি বেঁধে আনা উচিত। এত প্রতারণা করেছে যে আজ মুখ ঢেকে আদালতে আনতে হচ্ছে।” বিজেপির আরও অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এতদিন এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছিলেন রাজিব ঘোষ। বিরোধী মতের মানুষদের উপর চাপ সৃষ্টি, ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে তোলা আদায় এবং এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করার অভিযোগও তোলা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। যদিও এই সমস্ত অভিযোগ এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি। অন্যদিকে গোটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে এখনও পর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দলের জেলা নেতৃত্বও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর একের পর এক এলাকায় পুরনো অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করেছে। বহু ক্ষেত্রে বিরোধীরা সক্রিয় হয়ে অভিযোগ দায়ের করছেন এবং প্রশাসনও দ্রুত পদক্ষেপ করছে। তবে তৃণমূলের একাংশের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই ধরনের পদক্ষেপ করা হচ্ছে। যদিও দলের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলা হয়নি। ফলে গোটা বিষয়টি নিয়ে জল্পনা আরও বাড়ছে। এদিকে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রাজিব ঘোষের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলির বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে। পুরনো একাধিক অভিযোগপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি বুধবার রাতের ঘটনায় কারা উপস্থিত ছিলেন, কী ধরনের বৈঠক হচ্ছিল এবং সেখানে অন্য কেউ যুক্ত ছিলেন কিনা, সেই বিষয়েও তদন্ত চলছে। প্রয়োজন হলে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, দুর্গাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলে এই ঘটনায় আগামী দিনে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে আদালত চত্বরে বিজেপি কর্মীদের বিক্ষোভ এবং প্রকাশ্য স্লোগানবাজি নতুন করে রাজনৈতিক সংঘাতের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বর্তমানে পুরো ঘটনার দিকে নজর রয়েছে জেলা প্রশাসন এবং রাজনৈতিক মহলের। এখন দেখার, তদন্তের অগ্রগতিতে নতুন করে আরও কোনও তথ্য সামনে আসে কিনা এবং এই ঘটনায় আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে কতটা প্রভাব পড়ে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram