This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
দুর্গাপুর : আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে পশ্চিম বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করছে। এই আবহেই সামনে এসেছে নতুন এক বিতর্ক, যা ইতিমধ্যেই শাসক-বিরোধী রাজনীতির অঙ্গনে চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। অভিযোগের তীর সরাসরি বিজেপির দিকে, আর পাল্টা জবাবে বিজেপিও দায় চাপিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের উপর। ফলে পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক জটিল রাজনৈতিক তরজার সৃষ্টি হয়েছে। এক সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi “কংগ্রেস মুক্ত ভারত” গড়ার ডাক দিয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক স্লোগান আজও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আলোচনার বিষয়। বিরোধী শিবিরের দাবি, এই স্লোগান বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই বিজেপি বিভিন্ন সময়ে নানা রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সেই কৌশল ‘অনৈতিক’ বলেও অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিজেপি বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্রের ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিতর্কে। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রার্থী Debesh Chakraborty অভিযোগ করেছেন, তাঁর সমর্থনে লাগানো ব্যানার ও ফেস্টুন পরিকল্পিতভাবে ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর দাবি, এই কাজ করেছে বিজেপির কর্মী-সমর্থকরাই। ঘটনার সূত্রপাত সোমবার। ওই দিন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Amit Shah দুর্গাপুরে একটি বিশাল রোড শো করেন। শহরের বিভিন্ন প্রান্তে সেই রোড শো উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম হয়। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, এই রোড শো ছিল অভূতপূর্ব সাফল্য। কিন্তু সেই জমায়েত ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। দেবেশ চক্রবর্তীর অভিযোগ, ওই রোড শোতে আসা বিজেপির কর্মী-সমর্থকরাই তাঁর প্রচারের ব্যানার ও ফ্লেক্স ব্লেড দিয়ে কেটে দিয়েছে। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সামনে এসে তিনি তীব্র ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁর কথায়, “এটা শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, এটা গণতন্ত্রের উপর আঘাত।” তিনি আরও দাবি করেন, দুর্গাপুর মহিলা মহাবিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা, রাজীব গান্ধীর মূর্তির আশেপাশে এবং ইস্পাত নগরীর এডিশন রোডে তাঁর সমর্থনে লাগানো একাধিক ব্যানার ও ফ্লেক্স ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে তাঁর প্রচারকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা। দেবেশবাবু বলেন, “রোড শোতে যে ধরনের ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও তাণ্ডব আমরা দেখেছি, তা থেকেই স্পষ্ট যে কিছু উগ্র সমর্থক এই কাজ করতে পারে।” তিনি ‘ভৈরব বাহিনী’ শব্দ ব্যবহার করে বিজেপির একাংশের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করেন। এছাড়াও তিনি জানান, ঘটনাটি তিনি ইতিমধ্যেই রিটার্নিং অফিসারের নজরে এনেছেন এবং লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট এলাকায় থাকা সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা সম্ভব। তবে অভিযোগের সবচেয়ে গুরুতর দিক হল পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে তাঁর প্রশ্ন। দেবেশবাবুর অভিযোগ, প্রায় ২৪ ঘণ্টা কেটে গেলেও পুলিশ এই বিষয়ে কোনও সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। তাঁর মতে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
দুর্গাপুর পূর্বে ব্যানার-কাণ্ডে তুমুল বিতর্ক: কংগ্রেসের অভিযোগে বিজেপি, পাল্টা তৃণমূলকে দোষ চাপাল গেরুয়া শিবির
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি দুর্গাপুরের মহকুমা শাসকের কাছে লিখিতভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, “দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে হবে, না হলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” অন্যদিকে, বিজেপি এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করেছে। দলের পশ্চিম বর্ধমান জেলা মুখপাত্র Sumanta Mondal স্পষ্টভাবে বলেন, “বিজেপি এই ধরনের নোংরা রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না।” তিনি পাল্টা অভিযোগ করেন, এই ধরনের কাজ তৃণমূল কংগ্রেসের দুষ্কৃতীরাই করে থাকে। তাঁর দাবি, বিজেপির প্রার্থীদের সমর্থনে লাগানো ফ্লেক্স ও ব্যানারও একাধিক জায়গায় ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে। সুমন্ত মণ্ডলের কথায়, “এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করলেই সত্য সামনে চলে আসবে। বিজেপির বিরুদ্ধে এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।” তিনি আরও বলেন, “কংগ্রেস প্রার্থী আসলে নির্বাচনী প্রচারে ভেসে থাকার জন্যই এই ধরনের অভিযোগ তুলছেন।” তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “কংগ্রেস প্রার্থী নিজেও জানেন নির্বাচনের ফলাফল কী হতে চলেছে, তাই এই ধরনের নাটক করছেন।” একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দেন, “আর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজ্যে পরিবর্তন আসতে চলেছে, তারপর এই সমস্ত অপরাধমূলক কাজের হিসাব নেওয়া হবে।” পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তুমুল চর্চা। একদিকে কংগ্রেস প্রার্থীর গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে বিজেপির পাল্টা দাবি—এই দ্বন্দ্বে সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এই ধরনের অভিযোগ-প্রত্যঅভিযোগ নতুন নয়। তবে প্রতিটি ঘটনাই নির্বাচনী পরিবেশকে প্রভাবিত করে। বিশেষ করে যখন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। দুর্গাপুর পূর্ব কেন্দ্র এমনিতেই একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত হয়। এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে প্রতিটি ঘটনাই নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, প্রশাসন কতটা দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করতে পারে। সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য—সব কিছু খতিয়ে দেখে যদি প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা যায়, তবে এই বিতর্কের অবসান সম্ভব। নচেৎ, এই ঘটনা আরও বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হতে পারে, যা ভোটের ময়দানে প্রভাব ফেলতে বাধ্য। সব মিলিয়ে, দুর্গাপুর পূর্বের এই ব্যানার-কাণ্ড শুধু একটি সাধারণ ভাঙচুরের ঘটনা নয়—এটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির এক প্রতিফলন, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, এই ঘটনায় সত্যিই কে দায়ী এবং প্রশাসন কীভাবে তার মোকাবিলা করে।