ইসরোর ব্যর্থতার মাঝেই বেসরকারি সাফল্য, মহাকাশে ভারতের নতুন দিশা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
Beauro Report : ভারতের মহাকাশ গবেষণার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ যেন একটি দলগত খেলার প্রতিচ্ছবি। ক্রিকেট বা ফুটবলের মাঠে যেমন দেখা যায়—একজন খেলোয়াড় ব্যর্থ হলেও অন্য কেউ সামনে এসে দলের হাল ধরে নেয়, ঠিক তেমনই এক অদ্ভুত সমান্তরাল এখন দেখা যাচ্ছে দেশের স্পেস সেক্টরে। একদিকে ধাক্কা, অন্যদিকে সাফল্য—এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে ভারতের মহাকাশ অভিযান। সম্প্রতি একাধিক ব্যর্থতা চাপে ফেলেছে Indian Space Research Organisation বা ইসরো-কে। বিশেষ করে PSLV সিরিজের টানা দুটি মিশনের ব্যর্থতা বিজ্ঞানী মহলে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি উৎক্ষেপণের পরই ব্যর্থ হয় PSLV-C62 মিশন। উৎক্ষেপণের কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে রকেটটি এবং শেষপর্যন্ত হারিয়ে যায় মহাকাশে পাঠানো ১৫টি স্যাটেলাইট। এই ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ‘অন্বেষা’ নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপগ্রহের ক্ষতি। প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত নজরদারির জন্য তৈরি এই স্যাটেলাইটটির লক্ষ্য ছিল সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং বিশেষ করে শত্রু দেশের গতিবিধির ওপর নজর রাখা। ফলে এর ব্যর্থতা শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়। এর আগে গত বছরের ১৮ মে PSLV-C61 মিশনও ব্যর্থ হয়েছিল। মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে একই ধরনের লঞ্চ ভেহিকলের পরপর দুইবার ব্যর্থতা ইসরোর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে নির্ভরযোগ্যতার জন্য পরিচিত PSLV সিরিজ হঠাৎ করেই এই ধাক্কা খাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রস্তুতির ওপর। তবে এই ব্যর্থতার মাঝেই এসেছে এক বড় ইতিবাচক খবর, যা ভারতের মহাকাশ সক্ষমতাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে দেশ এখন অর্জন করেছে অত্যাধুনিক ‘ইন-অরবিট স্নুপিং’ প্রযুক্তি। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এটি এমন একটি ক্ষমতা যার মাধ্যমে নিজের কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইট ব্যবহার করে অন্য দেশের স্যাটেলাইটের ওপর নজরদারি চালানো সম্ভব। এই প্রযুক্তির সাফল্যের পেছনে রয়েছে গুজরাতের একটি স্টার্টআপ—Azista Industries Private Limited। সংস্থার আর্থ অবজারভেশন টিম একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে। তারা নিজেদের তৈরি স্বল্পপাল্লার একটি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে মহাকাশে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন করে নজরদারি চালায়। পরীক্ষার সময় দুই ধাপে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রথম ধাপে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরত্ব থেকে লক্ষ্য স্যাটেলাইটের ছবি তোলা হয়। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আরও কাছাকাছি, প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার দূর থেকে উচ্চমানের ছবি সংগ্রহ করা হয়। এই ছবিগুলি এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, সেগুলির মাধ্যমে শুধু স্যাটেলাইটের অবস্থানই নয়, তার কার্যকলাপ সম্পর্কেও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কোন দেশের স্যাটেলাইট কী ধরনের নজরদারি করছে, কোন অঞ্চলকে টার্গেট করা হচ্ছে, এমনকি কোন স্যাটেলাইট অন্য স্যাটেলাইটকে পর্যবেক্ষণ করছে—এসব বিষয়ও বোঝা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, এটি শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণাত্মক ক্ষমতা তৈরি করেছে।
ইসরোর ব্যর্থতার মাঝেই বেসরকারি সাফল্য, মহাকাশে ভারতের নতুন দিশা
মহাকাশে দ্বিমুখী ছবি: ব্যর্থতার ছায়া পেরিয়ে বেসরকারি সাফল্যে এগোচ্ছে ভারত
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটগুলির গতিবিধি রিয়েল-টাইমে ট্র্যাক করা সম্ভব হবে। কোনও সন্দেহজনক আচরণ নজরে এলে তাৎক্ষণিকভাবে তা শনাক্ত করা যাবে এবং প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে নজরদারিও চালানো সম্ভব হবে। বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এই ক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে সামরিক কৌশল এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় স্যাটেলাইটের ভূমিকা দিন দিন বাড়ছে। যুদ্ধক্ষেত্র হয়তো মাটিতে, কিন্তু সেই যুদ্ধের ফলাফল অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে মহাকাশে থাকা প্রযুক্তির মাধ্যমে। যোগাযোগ, নজরদারি, টার্গেটিং—সব ক্ষেত্রেই স্যাটেলাইট এখন অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে ভারতের হাতে ইন-অরবিট স্নুপিং প্রযুক্তির আগমন নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য। এটি শুধু দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে না, বরং আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—এই সাফল্য এসেছে বেসরকারি উদ্যোগে। এতদিন পর্যন্ত মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করত সরকারি সংস্থা ইসরো। তবে এখন ধীরে ধীরে বেসরকারি সংস্থাগুলিও এই ক্ষেত্রে প্রবেশ করছে এবং নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। এই পরিবর্তন ভারতের মহাকাশ গবেষণাকে আরও গতিশীল করে তুলছে। একদিকে যেখানে ইসরো তাদের অভিজ্ঞতা ও অবকাঠামো দিয়ে বড় মিশন পরিচালনা করছে, অন্যদিকে স্টার্টআপ ও বেসরকারি সংস্থাগুলি নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে ক্ষেত্রটিকে সমৃদ্ধ করছে। এই যৌথ প্রচেষ্টাই তৈরি করছে এক নতুন সমীকরণ। যেখানে ব্যর্থতা সাময়িকভাবে গতি কমালেও, অন্য কোনও সাফল্য আবার সেই শূন্যস্থান পূরণ করে দিচ্ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অগ্রগতি থেমে থাকছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে এই সহযোগিতা আরও বাড়ানো উচিত। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে কাজ করলে ভারতের মহাকাশ গবেষণা আরও দ্রুত এগোতে পারবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিও কিছুটা ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হবে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল—ইসরোর সাম্প্রতিক ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করা এবং তা দ্রুত সংশোধন করা। PSLV সিরিজের মতো একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্মকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে, বেসরকারি সংস্থাগুলির এই সাফল্যকে আরও উৎসাহিত করা প্রয়োজন। গবেষণা, বিনিয়োগ এবং নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে তাদের এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে তারা ভবিষ্যতেও এই ধরনের উদ্ভাবন চালিয়ে যেতে পারে। সব মিলিয়ে, ভারতের মহাকাশ গবেষণা এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সম্ভাবনা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে আগামী দিনের পথ। যদি এই ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, তাহলে খুব শীঘ্রই ভারত মহাকাশ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। আর সেই পথচলায় ব্যর্থতা নয়, বরং সাফল্যের ধারাবাহিকতাই হয়ে উঠবে দেশের পরিচয়।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram