হুগলী : প্রশাসনের নির্দেশ—রাতের মধ্যেই ময়দান চত্বরের অস্থায়ী দোকান সরিয়ে নিতে হবে। আর সেই নির্দেশ ঘিরেই কার্যত মাথায় হাত চুঁচুড়ার ময়দান চত্বরের শতাধিক ছোট ব্যবসায়ীর। বছরের পর বছর ধরে চা-বিস্কুট, পানীয়, খাবারদাবার থেকে শুরু করে ছোটখাটো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি করে কোনওরকমে সংসার চালিয়ে আসছেন এই ব্যবসায়ীরা। কিন্তু হঠাৎ দোকান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশে তাঁদের সামনে এখন তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। সামনেই দুর্গাপুজো। উৎসবের মরশুমে যেখানে বাড়তি আয়ের আশায় থাকেন বহু ছোট ব্যবসায়ী, ঠিক তার আগেই দোকান বন্ধ হয়ে গেলে সংসার চলবে কীভাবে, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁদের মধ্যে। চুঁচুড়ার ময়দান চত্বর দীর্ঘদিন ধরেই ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। রাস্তার ধারে বা ময়দানের আশপাশে অস্থায়ীভাবে তৈরি এই দোকানগুলির কোনওটি চায়ের, কোনওটি বিস্কুট বা জলখাবারের, আবার কোথাও বিক্রি হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় ছোটখাটো সামগ্রী। দোকানের আয়েই চলে অনেক পরিবারের দৈনন্দিন খরচ। কারও সন্তানের স্কুলের ফি, কারও কলেজের পড়াশোনা, কারও আবার বাড়ির বয়স্ক সদস্যের ওষুধ—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এই ছোট ব্যবসা। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, তাঁরা প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করতে চান না। সরকারি জায়গা দখল করে ব্যবসা করার অভিযোগ থাকলে প্রশাসন যে ব্যবস্থা নিতে পারে, সেটাও তাঁরা বুঝতে পারছেন। কিন্তু একইসঙ্গে তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা এই দোকানের উপর নির্ভর করে সংসার চালাচ্ছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও যেন প্রশাসন এবং সরকার ভাবেন। দোকান সরিয়ে নেওয়ার পর বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে বহু পরিবার কার্যত আয়ের পথ হারাবে বলে আশঙ্কা তাঁদের। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে মর্মস্পর্শী আবেদন এসেছে এক প্রতিবন্ধী দোকানদারের কাছ থেকে। তাঁর কথায়, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর জন্যই এই ছোট দোকান শুরু করেছিলেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই দোকানই হয়ে ওঠে তাঁর জীবিকার প্রধান অবলম্বন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অন্য কাজ পাওয়াও তাঁর কাছে সহজ নয়। ফলে প্রশাসনের নির্দেশে দোকান সরিয়ে নিলে তাঁর সামনে কী থাকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। প্রশাসনের নির্দেশ মেনে দোকান সরিয়ে নিতে তিনি প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন। তবে তাঁর একটাই আবেদন—সরকার যদি তাঁর জন্য একটি কাজের ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে তিনি দোকান সরিয়ে নেবেন। তাঁর এই আবেদন যেন শুধু একজন ব্যবসায়ীর নয়, বরং ময়দান চত্বরের আরও বহু ছোট ব্যবসায়ীর সমস্যার প্রতিচ্ছবি। কারও কাছে এই দোকান নিছক একটি ব্যবসার জায়গা নয়। কারও কাছে এটাই সন্তানের পড়াশোনার খরচ জোগানোর মাধ্যম। কারও কাছে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার টাকা আসে এই দোকানের আয় থেকে। আবার কারও কাছে এই ছোট দোকানই পুজোর আগে সংসারে বাড়তি কিছু টাকা আনার একমাত্র সুযোগ। ফলে দোকান সরানোর নির্দেশ তাঁদের কাছে শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁদের ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।

ইতিমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে চুঁচুড়ার বিধায়ক সুবীর নাগের কাছে কয়েকজন ব্যবসায়ী তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। বিধায়ক জানিয়েছেন, ছোটবেলা থেকেই এই ময়দানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় রয়েছে। এখানকার দোকানগুলির সঙ্গেও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। ব্যবসায়ীদের সমস্যার বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে একইসঙ্গে সুবীর নাগের বক্তব্য, কিছু দোকান রাস্তা দখল করে থাকার বিষয়টি প্রশাসনের তরফে তাঁকে জানানো হয়েছে। ফলে বিষয়টি শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার প্রশ্ন হিসেবে নয়, রাস্তা ও সরকারি জায়গা ব্যবহারের বিষয় হিসেবেও দেখতে হবে। এ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বিধায়ক আরও জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি প্রশাসনের সঙ্গেও বৈঠক করা হবে। সেখানে পুরো পরিস্থিতি পর্যালোচনা করার চেষ্টা করা হবে। দীর্ঘদিন ধরে যাঁরা এই ছোট ব্যবসার উপর নির্ভরশীল, তাঁদের কর্মসংস্থান যাতে সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেই দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন তিনি। এখন মূলত দুই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসছে। একদিকে রয়েছে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এবং সরকারি জায়গা ও রাস্তা দখলমুক্ত রাখার বিষয়টি। অন্যদিকে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছোট ব্যবসায়ীদের জীবিকা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। প্রশাসনের তরফে যদি দোকান সরানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়, তাহলে সেই ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প কোনও ব্যবস্থা করা হবে কি না, সেটাই এখন দেখার। বিশেষ করে দুর্গাপুজোর আগে এই নির্দেশ ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পুজোর মরশুমে সাধারণত ছোট দোকানগুলিতে ক্রেতাদের আনাগোনা বাড়ে। এই সময়েই অনেক ব্যবসায়ী বছরের গুরুত্বপূর্ণ কিছু আয়ের আশা করেন। ফলে উৎসবের ঠিক আগে দোকান সরানোর নির্দেশ তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা। তবে প্রশাসনের বক্তব্য ও সিদ্ধান্তই শেষ কথা। সরকারি জায়গা দখলমুক্ত রাখা এবং যান চলাচল স্বাভাবিক রাখার প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার বিষয়টিও আলোচনার টেবিলে কতটা গুরুত্ব পায়, সেটাই এখন নজরে। কারণ একটি দোকান সরিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি কাঠামো সরানো নয়—তার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের আয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা। তাই চুঁচুড়ার ময়দান চত্বরের শতাধিক ছোট ব্যবসায়ীর সামনে এখন একটাই প্রশ্ন—প্রশাসনের নির্দেশে দোকান সরবে, কিন্তু তারপর? সরকারি জায়গা খালি হবে, রাস্তা দখলমুক্ত হবে—কিন্তু যাঁদের জীবনের শেষ সম্বল এই ছোট দোকান, তাঁদের জন্য কি তৈরি হবে বিকল্প কর্মসংস্থানের পথ? বিধায়কের উদ্যোগ এবং প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর এই সমস্যার কোনও সমাধানসূত্র বেরিয়ে আসে কি না, এখন সেদিকেই তাকিয়ে ব্যবসায়ী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। উত্তর অপেক্ষায় চুঁচুড়ার ময়দান চত্বরের শতাধিক পরিবার।