গ্যাস বুকিংয়ে হুড়োহুড়ি, সতর্ক করল কেন্দ্র

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
নয়াদিল্লি : মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি। ইরান, ইজরায়েল এবং আমেরিকাকে ঘিরে যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে। বিশেষ করে তেল ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে অনেক দেশেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এই পরিস্থিতিতে ভারতেও যাতে কোনও ধরনের জ্বালানি সঙ্কট না দেখা দেয়, সেই বিষয়ে সতর্ক হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। ফলে ওই অঞ্চলে যুদ্ধ বা অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি আমদানির উপর। সেই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই ভারতের কেন্দ্রীয় বিদেশমন্ত্রক এবং জ্বালানি মন্ত্রক ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ইরানের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। সেই আলোচনার ফলেই ইতিমধ্যেই জ্বালানি বোঝাই দুটি ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে ভারতে আসার অনুমতি দিয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন করা হয়। এই পথ যদি কোনও কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এই পরিস্থিতিতে ইরানের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। কারণ এই প্রণালী দিয়ে নিরাপদে জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করা গেলে দেশের জ্বালানি সরবরাহে কোনও বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হবে না। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে যে দেশে গৃহস্থালীর রান্নার গ্যাস বা এলপিজি সিলিন্ডারের কোনও ঘাটতি নেই। যদিও আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে কিছু ক্ষেত্রে দামের উপর প্রভাব পড়তে পারে, তবুও সরবরাহের ক্ষেত্রে কোনও সংকট তৈরি হয়নি বলে দাবি করেছে কেন্দ্র। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অনেক গ্রাহক এই পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বাড়িতে সিলিন্ডার থাকা সত্ত্বেও অনেকেই নতুন করে গ্যাস সিলিন্ডার বুক করতে শুরু করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা যাচ্ছে যে বাড়িতে অর্ধেক ভর্তি সিলিন্ডার থাকা সত্ত্বেও মানুষ আগেভাগেই নতুন সিলিন্ডারের জন্য বুকিং করে ফেলছেন। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উপর হঠাৎ করেই প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। যারা সত্যিই গ্যাসের প্রয়োজন নিয়ে বুকিং করতে চাইছেন, তারা অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। বুকিং করতে গিয়ে অনেক সময় ওটিপি পাচ্ছেন না, আবার অনেক ক্ষেত্রে বুকিং প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে দেরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক ইতিমধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা জারি করেছে। সেখানে রাজ্য সরকারগুলিকে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে অপ্রয়োজনীয় গ্যাস বুকিং বন্ধ করতে ব্যবস্থা নিতে হবে। মন্ত্রকের তরফে বলা হয়েছে, গ্যাস বুকিং শুধুমাত্র তাদের জন্যই হওয়া উচিত যাদের সত্যিই সিলিন্ডারের প্রয়োজন রয়েছে। যারা বাড়িতে সিলিন্ডার শেষ হওয়ার আগেই আগাম বুকিং করছেন, তাদের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী গত কয়েকদিনে সারা দেশে এলপিজি সিলিন্ডার বুকিং অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১১ মার্চ সারা দেশে প্রায় ৬.৯০৭ মিলিয়ন গ্যাস সিলিন্ডারের বুকিং করা হয়েছিল। পরের দিন অর্থাৎ ১২ মার্চ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭.৫৭ মিলিয়নে।
গ্যাস বুকিংয়ে হুড়োহুড়ি, সতর্ক করল কেন্দ্র
হরমুজ পেরিয়ে এল জ্বালানি জাহাজ, গ্যাস নিয়ে নতুন নির্দেশিকা কেন্দ্রের
কিন্তু তার পরের দিন অর্থাৎ ১৩ মার্চ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ওই দিন সারা দেশে মোট ৮.৮৮ মিলিয়ন গ্যাস সিলিন্ডার বুকিং হয়। অর্থাৎ মাত্র একদিনের মধ্যে প্রায় ১৩ লক্ষ অতিরিক্ত সিলিন্ডারের বুকিং করা হয়েছে। এই হঠাৎ বুকিং বৃদ্ধির ফলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। অনেকের কাছে মনে হচ্ছে দেশে হয়তো গ্যাসের বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে বাস্তবে এমন কোনও সঙ্কট নেই। কেন্দ্রের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু মানুষের অযথা উদ্বেগ এবং আতঙ্কের কারণে বুকিংয়ের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। এর ফলে বিতরণ ব্যবস্থায় সাময়িক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। আরও একটি গুরুতর সমস্যা সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে এসেছে যে কিছু হোটেল ও রেস্তোরাঁ গৃহস্থালীর গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দামে সিলিন্ডার কিনে নিচ্ছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, কিছু এলাকায় গৃহস্থালীর জন্য বরাদ্দ সিলিন্ডার প্রায় পাঁচ হাজার টাকার মতো দামে বিক্রি হচ্ছে। যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে কেন্দ্র। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে একাধিক পরিদর্শন ও অভিযান চালানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যের প্রায় ১৩০০টি এলাকায় এই ধরনের কালোবাজারির ঘটনা সামনে এসেছে। এছাড়াও কেন্দ্র আরও একটি বিষয় লক্ষ্য করেছে। যেসব গ্রাহক ইতিমধ্যেই পাইপলাইনের মাধ্যমে রান্নার গ্যাস ব্যবহার করছেন, তারাও অনেক ক্ষেত্রে এলপিজি সিলিন্ডার বুকিং করছেন। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে। এই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলিকে এই ধরনের বুকিং বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছে। একই সঙ্গে বলা হয়েছে যে স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের উপর কড়া নজরদারি রাখতে হবে। বিশেষ করে বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে গ্যাস সরবরাহ যাতে সঠিকভাবে হয়, তা নিশ্চিত করার জন্য রাজ্য সরকারগুলিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। হোটেল, রেস্তোরাঁ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে যাতে কোনও অনিয়ম না হয়, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে যদি কেউ গ্যাস সিলিন্ডার কালোবাজারে বিক্রি করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। যাদের বাড়িতে পর্যাপ্ত গ্যাস রয়েছে, তাদের অযথা বুকিং না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার মনে করছে, এই পরিস্থিতি সাময়িক। কারণ ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা ইতিমধ্যেই এগোচ্ছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক থাকলে আগামী দিনগুলিতে গ্যাস সরবরাহ আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনও কারণ নেই বলেই জানিয়েছে কেন্দ্র। বরং পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ভারতের জ্বালানি সরবরাহ বর্তমানে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। তবে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক এবং অযথা বুকিং পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে। এই কারণেই কেন্দ্রীয় সরকার সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার এবং প্রয়োজন ছাড়া গ্যাস সিলিন্ডার বুকিং না করার আহ্বান জানিয়েছে।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram