
দুর্গাপুর : বৃষ্টি থেমে গিয়েছে বেশ কয়েকদিন আগেই। কিন্তু বৃষ্টি থামলেও জলযন্ত্রণা থেকে যেন রেহাই মিলছে না দুর্গাপুরের কাঁকসা থানার অন্তর্গত আড়া মোড় বাজারের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের। টানা প্রায় ১৫ দিন ধরে জলমগ্ন হয়ে রয়েছে গোটা বাজার এলাকা। কোথাও হাঁটুজল, কোথাও আবার রাস্তার চেহারা কার্যত জলাশয়ের মতো। নোংরা জল পেরিয়েই প্রতিদিন দোকানে ঢুকতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। একই পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে বাজারে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে সাধারণ ক্রেতাদেরও। শুধু রাস্তা নয়, জমা জল ঢুকে পড়েছে একাধিক বাড়িতেও। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জলবন্দি পরিস্থিতিতে ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তাঁদের অভিযোগ, বারবার প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে জানানো হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, আড়া মোড় বাজারের নিকাশি ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই সমস্যায় জর্জরিত। বৃষ্টির জল দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার মতো কার্যকর নালা বা নিকাশি ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জল জমে যায়। তবে এবারের পরিস্থিতি আরও গুরুতর। প্রায় ১৫ দিন ধরে জল জমে থাকায় বাজারের স্বাভাবিক জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত। দোকানের সামনে জমে রয়েছে নোংরা জল। সেই জল ডিঙিয়েই দোকানে প্রবেশ করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ক্রেতাদের অনেকেই জলমগ্ন রাস্তা এড়িয়ে চলছেন। এর জেরে ব্যবসায়িক লেনদেনেও প্রভাব পড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, হিন্দুস্থান ফার্টিলাইজারের পরিত্যক্ত আবাসন এলাকা থেকে জল নেমে এসে আড়া মোড় বাজারে জমা হচ্ছে। সেই জল বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। কোথাও নিকাশি নালা বন্ধ হয়ে রয়েছে, কোথাও আবার দীর্ঘদিন পরিষ্কার না হওয়ায় জল চলাচলের পথ কার্যত অবরুদ্ধ। ফলে একদিকে যেমন বাজারে জমছে জল, অন্যদিকে জল বের হতে না পারায় দিনের পর দিন একই অবস্থায় পড়ে থাকছে এলাকা।

জল জমে থাকার কারণে শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতিই নয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। জলমগ্ন রাস্তার কোথায় গর্ত রয়েছে বা কোথায় রাস্তার পরিস্থিতি খারাপ, তা বোঝা যাচ্ছে না। ফলে পথচারীদের পাশাপাশি বাইকচালকদেরও যথেষ্ট সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পরিবারগুলির মধ্যে। জল পেরিয়ে যাতায়াত করতে গিয়ে যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শনিবার সকালে আড়া মোড় বাজারে পৌঁছন দুর্গাপুর পূর্বের বিজেপি বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়। জলমগ্ন বাজার এলাকা সরেজমিনে খতিয়ে দেখেন তিনি। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সমস্যার কথা শোনেন। এরপর জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে সঙ্গে আনা হয় JCB এবং ভ্যাকুম ক্লিনার। বন্ধ হয়ে থাকা নিকাশি ব্যবস্থা সচল করা এবং জমে থাকা জল দ্রুত সরানোর কাজ শুরু হয়। জল নিষ্কাশনের কাজে JCB এবং ভ্যাকুম ক্লিনার নামায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে স্থানীয়দের মধ্যে। বাজারের জমে থাকা জল সরিয়ে নিকাশি পথ পরিষ্কার করার চেষ্টা শুরু হয়। তবে ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, সাময়িকভাবে জল সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। আগামী দিনে যাতে বৃষ্টির জল কিংবা অন্য কোনও উৎস থেকে জল এসে ফের বাজারে জমতে না পারে, তার জন্য স্থায়ী নিকাশি ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি তাঁদের।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে জল জমে থাকার কারণে দোকানের সামনে ক্রেতাদের দাঁড়ানোর জায়গা থাকছে না। দোকানে যাতায়াত করতেও সমস্যা হচ্ছে। নোংরা জল পেরিয়ে ক্রেতারা দোকানে আসতে চাইছেন না। ফলে পুজোর মরশুম সামনে থাকলেও ব্যবসা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। দুর্গাপুজোর আগে বাজারে কেনাকাটার ভিড় বাড়ার কথা। তার আগে যদি জল নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না করা যায়, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে, বিধায়ক চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তৃণমূল আমলে সরকারি জমি দখল করে বিভিন্ন নির্মাণ হওয়ার কারণে এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, এর ফলে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং তারই প্রভাব পড়ছে আড়া মোড় বাজারে। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। বিধায়কের বক্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও। তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে স্থানীয়দের একটাই দাবি—দীর্ঘদিনের জলযন্ত্রণা থেকে দ্রুত মুক্তি। শুধু অস্থায়ীভাবে জল সরানো নয়, জল কোথা থেকে আসছে এবং কোন পথে তা নিষ্কাশন করা সম্ভব, তা চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধান করা হোক। বাজারের ব্যবসায়ী থেকে সাধারণ বাসিন্দা, সকলেরই দাবি, স্বাভাবিক জনজীবন ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ করুক প্রশাসন। আড়া মোড় বাজারে শনিবার JCB এবং ভ্যাকুম ক্লিনার নামিয়ে জল সরানোর কাজ শুরু হলেও, আগামী দিনে এই উদ্যোগ কতটা স্থায়ী সমাধান এনে দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে স্থানীয়রা।