Log in

বোলপুর : দুর্গাপুজোর মুখে উচ্ছেদের নোটিশ ঘিরে তীব্র উত্তেজনা ছড়াল বীরভূমের বোলপুরের নেতাজি মার্কেট এলাকায়। সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা অননুমোদিত দোকানপাট এবং বিভিন্ন নির্মাণ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়ে ব্যবসায়ীদের হাতে সাত দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে বীরভূম জেলা নিয়ন্ত্রিত বাজার সমিতি। আর এই নোটিশ সামনে আসতেই কার্যত মাথায় হাত পড়েছে দীর্ঘদিন ধরে বাজারে ব্যবসা করে আসা বহু ব্যবসায়ীর। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রায় ২০০ জনকে এই উচ্ছেদ সংক্রান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। পুজোর মরশুমের ঠিক আগে এমন নোটিশ ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা। জানা গিয়েছে, গত ১০ সেপ্টেম্বর ব্যবসায়ীদের হাতে এই নোটিশ পৌঁছয়। নোটিশে সরকারি জমিতে অনুমোদন ছাড়াই তৈরি হওয়া বিভিন্ন স্থায়ী এবং অস্থায়ী কাঠামো সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোকান, ঘর, শেড, বেড়া-সহ একাধিক নির্মাণ সরকারি জমি দখল করে বা অনুমোদন ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ। এই ধরনের নির্মাণের কারণে বাজারের স্বাভাবিক পরিচালনা এবং সরকারি সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হচ্ছে বলেই নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ওই সমস্ত স্থাপনা সরিয়ে না নিলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে। নোটিশ হাতে পাওয়ার পর থেকেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে শুরু হয় দুশ্চিন্তা। দীর্ঘদিন ধরে নেতাজি মার্কেটে দোকান করে বহু ব্যবসায়ীর সংসার চলে। কেউ বছরের পর বছর ধরে সেখানে ব্যবসা করছেন, আবার কারও পরিবারের একাধিক সদস্যের জীবিকা নির্ভর করে ওই দোকানের উপার্জনের উপর। ফলে হঠাৎ করে দোকান সরিয়ে ফেলার নির্দেশে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তার উপর সামনে দুর্গাপুজো। বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার মরশুমে দোকান বন্ধ বা উচ্ছেদের মুখে পড়লে তাঁদের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও করছেন ব্যবসায়ীরা। এই পরিস্থিতিতে শুক্রবার সমস্ত দোকান বন্ধ রেখে প্রতিবাদে নামেন নেতাজি মার্কেটের ব্যবসায়ীরা। দোকানের ঝাঁপ বন্ধ রেখে তাঁরা বিক্ষোভ দেখান এবং প্রশাসনের কাছে তাঁদের দাবি জানান। বিক্ষোভে ব্যবসায়ীদের একাংশকে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়তেও দেখা যায়। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা এই মার্কেটে ব্যবসা করে আসছেন। ব্যবসার উপর নির্ভর করেই তাঁদের পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা এবং অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো হয়। আচমকা উচ্ছেদ করা হলে তাঁরা কোথায় যাবেন এবং কীভাবে নতুন করে ব্যবসা শুরু করবেন, তা নিয়ে কার্যত অন্ধকারে রয়েছেন তাঁরা। ব্যবসায়ীদের আরও দাবি, যদি সরকারি জমি সংক্রান্ত কোনও সমস্যা থেকে থাকে, তাহলে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান করা হোক। সরাসরি উচ্ছেদের পথে না গিয়ে তাঁদের বক্তব্য শোনা এবং বিকল্প ব্যবস্থা করার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। বিশেষ করে যাঁরা বহু বছর ধরে ওই বাজারে ব্যবসা করছেন, তাঁদের জন্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, তাঁদের দোকান ভেঙে বা সরিয়ে দেওয়ার আগে বিকল্প জায়গা কিংবা উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তা না হলে কয়েকশো পরিবারের জীবিকা কার্যত বিপন্ন হয়ে পড়বে। পুজোর আগে ব্যবসায়ীদের কাছে এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের কেনাকাটা বাড়ে, বাজারে বিক্রিবাটাও অন্যান্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়। বছরের এই সময়টাকেই সামনে রেখে বহু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত পণ্য মজুত করেন। কিন্তু উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়ার পর সেই ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে বলে দাবি তাঁদের। একদিকে পুজোর বাজার ধরার প্রস্তুতি, অন্যদিকে সাত দিনের মধ্যে দোকান সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ—দুইয়ের মাঝে কার্যত দিশেহারা ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এত অল্প সময়ের মধ্যে দোকান সরিয়ে নেওয়া তাঁদের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। শুধু দোকানের কাঠামো সরানোই নয়, ব্যবসার পণ্য, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সামগ্রী অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্যও সময় প্রয়োজন। নতুন জায়গা খুঁজে সেখানে ব্যবসা শুরু করার বিষয়টিও সহজ নয়। ফলে সাত দিনের সময়সীমা পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এদিকে, সরকারি জমি দখলমুক্ত রাখা এবং বাজারের সুষ্ঠু পরিচালনার প্রশ্নে প্রশাসনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে। সরকারি জমিতে অনুমোদনহীন নির্মাণ থাকলে তা নিয়ম মেনে সরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রশাসনের হাতে থাকতেই পারে। তবে একইসঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওই জায়গায় ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষগুলির ভবিষ্যৎ নিয়েও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। নেতাজি মার্কেটের এই পরিস্থিতিতে এখন মূল প্রশ্ন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রশাসনের কোনও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের হবে কি না। উচ্ছেদের আগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে কি না, কিংবা ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প কোনও জায়গা নির্ধারণ করা হবে কি না—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন তাঁরা। কারণ তাঁদের বক্তব্য, তাঁরা প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চান না। তাঁরা চান আলোচনার মাধ্যমে একটি স্থায়ী এবং মানবিক সমাধান। শুক্রবার দোকান বন্ধ রেখে বিক্ষোভের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভ এবং আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছেন ব্যবসায়ীরা। এখন তাঁদের দাবি, দ্রুত প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের সঙ্গে বৈঠক করা হোক এবং উচ্ছেদ সংক্রান্ত নোটিশ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হোক। পুজোর মুখে যাতে শত শত পরিবারের রুজি-রোজগার অনিশ্চয়তার মধ্যে না পড়ে, সেই বিষয়টিও বিবেচনা করার আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে দুর্গাপুজোর ঠিক আগে বোলপুরের নেতাজি মার্কেটে উচ্ছেদের নোটিশ ঘিরে তৈরি হয়েছে চাপা উত্তেজনা। সরকারি জমি এবং বাজার পরিচালনার নিয়মের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের দাবির টানাপোড়েনে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেটাই দেখার। ব্যবসায়ীদের একটাই দাবি—উচ্ছেদের আগে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হোক, পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হোক এবং দীর্ঘদিনের ব্যবসা ও জীবিকার কথা মাথায় রেখে মানবিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *