'DIGITAL ARREST' কেলেঙ্কারি, লখনউ থেকে অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার অন্ডাল থানার

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
অন্ডাল : ডিজিটাল যুগের সুবিধার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার প্রতারণার জাল। আর সেই জালেই এবার প্রায় সর্বস্বান্ত হতে বসেছিলেন এক প্রাক্তন স্কুল শিক্ষক। তবে তৎপর পুলিশি পদক্ষেপে বড়সড় সাফল্য পেল অন্ডাল থানা। তথাকথিত ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ কৌশলে ৩১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় উত্তরপ্রদেশের লখনৌ থেকে মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘটনায় একদিকে যেমন সামনে এসেছে প্রতারকদের নতুন কৌশল, অন্যদিকে তেমনই উঠে এসেছে পুলিশের দ্রুত ও সমন্বিত তদন্তের নজির। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মোহাম্মদ জামিল আহমদ নামে এক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষকের মোবাইলে হঠাৎই আসে একটি ফোন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে নিজেকে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিক পরিচয় দিয়ে কথা বলা হয়। অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ও কড়া সুরে জানানো হয়, তাঁর বিরুদ্ধে নাকি হাওলা লেনদেনে জড়িত থাকার একাধিক প্রমাণ রয়েছে। এমনকি বলা হয়, একটি বড় আর্থিক চক্রের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে গেছে এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। এরপরই শুরু হয় মানসিক চাপ সৃষ্টি। তাঁকে জানানো হয়, তদন্তের স্বার্থে তাঁকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি ঘর থেকে বেরোতে পারবেন না, কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না এবং পুরো সময় তাঁকে ভিডিও কলে নজরবন্দি থাকতে হবে। ভয় দেখিয়ে বলা হয়, নির্দেশ অমান্য করলে সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হবে। একজন সাধারণ অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, যাঁর গোটা জীবন কেটেছে নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে, হঠাৎ এমন অভিযোগে ভেঙে পড়েন মানসিকভাবে। প্রতারকেরা সেই দুর্বলতাকেই কাজে লাগায়। মামলা মিটিয়ে দেওয়ার নাম করে অর্থ দাবি করা হয়। বলা হয়, নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা জমা দিলেই তদন্ত “সাময়িকভাবে স্থগিত” রাখা হবে এবং তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। প্রথম দফায় ২৭ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করতে বাধ্য হন ওই শিক্ষক। এরপরও চাপ থামেনি। আরও ভয় দেখিয়ে দ্বিতীয় দফায় অতিরিক্ত ৪ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে প্রতারকদের জালে খোয়া যায় ৩১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা— এক অবসরপ্রাপ্ত মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়ের বড় অংশ। কিছুদিন পর সন্দেহ জাগতে শুরু করে তাঁর মনে। তথাকথিত তদন্তের আর কোনও অগ্রগতি নেই, বরং বারবার নতুন অজুহাতে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা চক্র। অবশেষে সাহস সঞ্চয় করে ১১ জানুয়ারি অন্ডাল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। অভিযোগ পেয়ে দ্রুত তদন্তে নামে পুলিশ।

অন্ডাল থানার তদন্তকারী দল কল ডিটেল রেকর্ড, ব্যাংক লেনদেনের তথ্য এবং ডিজিটাল ট্রেইল খতিয়ে দেখতে শুরু করে। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে উঠে আসে প্রদীপ কুমার মিশ্র নামে এক ব্যক্তির নাম। তদন্তে জানা যায়, সে উত্তরপ্রদেশের লখনৌ শহরের গোমতীনগর এলাকার বাসিন্দা। বিভিন্ন ভুয়ো পরিচয় ও একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এই প্রতারণা চক্র পরিচালিত হচ্ছিল বলে প্রাথমিকভাবে অনুমান পুলিশের। অভিযুক্তের অবস্থান নিশ্চিত করার পর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি সাব-ইন্সপেক্টর চন্দন চ্যাটার্জির নেতৃত্বে অন্ডাল থানার একটি বিশেষ দল উত্তরপ্রদেশে রওনা দেয়। স্থানীয় থানার সঙ্গে সমন্বয় করে গোমতীনগর এলাকায় অভিযান চালানো হয়। সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে প্রদীপ কুমার মিশ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শনিবার ভোরে তাকে অন্ডাল থানায় নিয়ে আসা হয়। শনিবারই অভিযুক্তকে দুর্গাপুর মহাকুমা আদালতে পেশ করা হয়। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ তার ১০ দিনের হেফাজতের আবেদন জানিয়েছে বলে সূত্রের খবর। পুলিশ মনে করছে, জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তির নাম সামনে আসতে পারে। পাশাপাশি, অর্থ লেনদেনের সম্পূর্ণ রুট খতিয়ে দেখে প্রতারিত টাকার কিছুটা হলেও উদ্ধার সম্ভব কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল, ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ নামে কোনও বৈধ প্রক্রিয়া নেই। কেন্দ্রীয় বা রাজ্য কোনও তদন্তকারী সংস্থা কখনও ফোন বা ভিডিও কলে কাউকে গ্রেপ্তার করে না কিংবা মামলা মেটানোর জন্য ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা দিতে বলে না। প্রতারকেরা সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা, ভয় এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে সীমিত ধারণাকে হাতিয়ার করে এভাবেই ফাঁদ পাতে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের সতর্ক থাকার আবেদন জানানো হয়েছে। অচেনা নম্বর থেকে এ ধরনের ফোন এলে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কোনও সংস্থা বা অফিসারের পরিচয় দাবি করলে তা সরকারি ওয়েবসাইট বা হেল্পলাইনের মাধ্যমে যাচাই করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, সন্দেহজনক লেনদেন বা হুমকির ঘটনা ঘটলে দ্রুত নিকটবর্তী থানায় অথবা সাইবার ক্রাইম পোর্টালে অভিযোগ জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে। অন্ডাল থানার এই সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আন্তঃরাজ্য সমন্বয়, প্রযুক্তিগত তদন্ত এবং দ্রুত পদক্ষেপ— সব মিলিয়ে এই গ্রেপ্তারি সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনবে বলেই মনে করছেন অনেকেই। তবে একই সঙ্গে এই ঘটনা একটি বড় সতর্কবার্তাও বহন করছে— ডিজিটাল যুগে নিরাপত্তা শুধু পাসওয়ার্ডে নয়, সচেতনতাতেও নিহিত। একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এই প্রতারণা আমাদের সকলের জন্য শিক্ষা হয়ে থাকুক। ভয় নয়, সচেতনতা— এই হোক সাইবার অপরাধ রুখতে প্রধান অস্ত্র। আর পুলিশের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে, আইন নিজের গতিতেই চলে; অপরাধীরা যত দূরেই লুকিয়ে থাকুক, প্রযুক্তির জালে শেষ পর্যন্ত ধরা পড়তেই হয়।
Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram