
দুর্গাপুর : মধ্যপ্রদেশের বাগেশ্বর ধামের ধীরেন্দ্রকৃষ্ণ শাস্ত্রী, যিনি বাগেশ্বর বাবা নামে পরিচিত, তাঁর দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। দুর্গাপূজার মতো বাঙালির অন্যতম প্রধান উৎসবকে ঘিরে তাঁর মন্তব্যের প্রতিবাদে এবার দুর্গাপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করল জাতীয় কংগ্রেস। বৃহস্পতিবার এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুর্গাপুরে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বিক্ষোভও প্রদর্শন করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, সম্প্রতি লিলুয়ার একটি অনুষ্ঠানে দুর্গোৎসব চলাকালীন আমিষ খাবার খাওয়ার প্রসঙ্গে বাগেশ্বর বাবা আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন। তাঁর সেই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই রাজ্যজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি কংগ্রেসের। বৃহস্পতিবার সেই বিতর্কের আঁচ এসে পৌঁছয় শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরেও। জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে দুর্গাপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগের পাশাপাশি থানার সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেন কংগ্রেস কর্মী-সমর্থকেরা। কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বর্ধমান জেলা জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী-সহ দলের অন্যান্য নেতৃত্ব, কর্মী ও সমর্থকেরা। কংগ্রেসের অভিযোগ, বাগেশ্বর বাবার ওই মন্তব্য শুধু ধর্মীয় আবেগের বিষয় নয়, এর সঙ্গে বাঙালির সংস্কৃতি এবং দীর্ঘদিনের দুর্গাপূজার ঐতিহ্যও জড়িয়ে রয়েছে। দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার গ্রহণকে ঘিরে বাগেশ্বর বাবার বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে প্রশাসনিকভাবে অভিযোগ জানানো হয়। দলের দাবি, ধর্মীয় বিশ্বাস বা ব্যক্তিগত মত প্রকাশের নামে এমন কোনও মন্তব্য করা উচিত নয়, যা একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়, সংস্কৃতি বা মানুষের আবেগকে আঘাত করতে পারে।

এই ঘটনার প্রতিবাদে এদিন দুর্গাপুরে কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে যথেষ্ট ক্ষোভ দেখা যায়। বিক্ষোভ চলাকালীন কংগ্রেস কর্মীদের হাতে ছিল বাগেশ্বর বাবার ছবি ও পোস্টার। বিক্ষোভকারীরা তাঁর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে এবং জুতোপেটা করে প্রতিবাদ জানান। ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিছু সময়ের জন্য তৈরি হয় উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। যদিও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই কর্মসূচিকে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের প্রতিবাদ হিসেবেই দাবি করা হয়েছে। জেলা কংগ্রেস সভাপতি দেবেশ চক্রবর্তী-সহ দলের নেতৃত্বের বক্তব্য, দুর্গাপূজা বাঙালির আবেগ, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই উৎসবকে ঘিরে কোনও স্বঘোষিত ধর্মগুরুর আপত্তিকর মন্তব্য মেনে নেওয়া হবে না বলেই দাবি কংগ্রেসের। তাঁদের অভিযোগ, একটি সর্বজনীন উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে মন্তব্য করে বিভাজনের পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই ধরনের মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছে জাতীয় কংগ্রেস। এদিকে, বাগেশ্বর বাবার ওই মন্তব্যের পর থেকেই সামাজিক মাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। তাঁর বক্তব্যের পক্ষে যেমন কেউ কেউ মত প্রকাশ করছেন, তেমনই বিরোধিতাতেও সরব হয়েছেন অনেকে। বিশেষ করে বাংলায় দুর্গাপূজার সঙ্গে আমিষ খাবারের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্রের কথা তুলে ধরে তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করা হচ্ছে। সেই বিতর্কের মধ্যেই দুর্গাপুরে কংগ্রেসের এই অভিযোগ ও বিক্ষোভ নতুন করে রাজনৈতিক চাপানউতোর তৈরি করেছে।

কংগ্রেসের দাবি, ধর্মীয় বিষয়ে বক্তব্য রাখার ক্ষেত্রে সকলেরই দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন। কোনও নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব বা মানুষের বিশ্বাসকে কেন্দ্র করে এমন মন্তব্য করা উচিত নয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বা বিভাজন তৈরি করতে পারে। বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষিতেই দুর্গাপুর থানায় অভিযোগ জানিয়ে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে দল। তবে এই ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক যে এখানেই থামছে না, তা বলাই যায়। দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার খাওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় মতামত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতামত প্রকাশের ধরন এবং তা ঘিরে সাধারণ মানুষের আবেগে আঘাত লাগছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। একদিকে বাগেশ্বর বাবার বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্ক, অন্যদিকে তার প্রতিবাদে কংগ্রেসের থানায় অভিযোগ ও বিক্ষোভ—দুই ঘটনাই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এদিন দুর্গাপুরে কংগ্রেসের বিক্ষোভে পোস্টার ছেঁড়া এবং জুতোপেটার মতো ঘটনাও সামনে আসে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যের প্রতিবাদ জানানো হলেও, সেই প্রতিবাদের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে কী প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, সেদিকেও নজর থাকবে। পাশাপাশি দুর্গাপুর থানায় দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে, দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে বাগেশ্বর বাবার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক ক্রমশই রাজনৈতিক রূপ নিচ্ছে। লিলুয়ার অনুষ্ঠানে করা মন্তব্যের জেরে রাজ্যজুড়ে তৈরি হওয়া আলোচনার পর এবার দুর্গাপুরে থানায় অভিযোগ এবং বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করল জাতীয় কংগ্রেস। ফলে এই মন্তব্যকে ঘিরে আগামী দিনে রাজনৈতিক তরজা আরও কতটা বাড়ে, এখন সেটাই দেখার।