This site uses cookies for analytics and to improve your experience. By clicking Accept, you consent to our use of cookies. Learn more in our privacy policy.
মধ্যপ্রাচ্য : বিশ্বজুড়ে অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে যখন জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন ভারতের জন্য এক বড় স্বস্তির খবর সামনে এসেছে। ভারতের পতাকা বহনকারী একটি এলপিজি ট্যাঙ্কার নিরাপদে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ Strait of Hormuz পেরিয়ে ভারতের দিকে রওনা দিয়েছে। জাহাজটিতে রয়েছে কয়েক হাজার টন LPG বা তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস, যা মূলত গৃহস্থালির রান্নার কাজে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে যখন অনেক জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করতে সাহস পাচ্ছিল না, তখন ভারতের এই জাহাজের নিরাপদে হরমুজ পেরিয়ে আসা দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্রে Strait of Hormuz একটি অত্যন্ত কৌশলগত সমুদ্রপথ। পারস্য উপসাগর এবং ওমান উপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথের উপর নির্ভর করে বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২০ শতাংশ বৈশ্বিক তেল পরিবহন এই প্রণালী দিয়েই হয়। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর অধিকাংশ তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছায়। ফলে এই প্রণালীতে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই বিশ্ব বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। ভারতের জন্য এই সমুদ্রপথের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ ভারতের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশই আমদানির উপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে LPG বা রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রে দেশের আমদানি নির্ভরতা অনেক বেশি। ভারতের বছরে প্রায় ৩১ থেকে ৩২ মিলিয়ন টনের মতো LPG ব্যবহার হয়। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। আর সেই আমদানির প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই গ্যাসবাহী জাহাজগুলোকে Strait of Hormuz পেরিয়েই ভারতীয় বন্দরে পৌঁছাতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা বাড়ার ফলে এই সমুদ্রপথ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ওই অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছু শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় বা অন্য রুট ব্যবহার করতে শুরু করে। এর ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও একই আশঙ্কা দেখা দেয়, কারণ দেশের কোটি কোটি পরিবার প্রতিদিনের রান্নার জন্য LPG গ্যাসের উপর নির্ভর করে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় LPG ব্যবহারের সংখ্যা গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। কেন্দ্র সরকারের উজ্জ্বলা প্রকল্প চালু হওয়ার পর বহু দরিদ্র পরিবার প্রথমবারের মতো রান্নার গ্যাস ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে। বর্তমানে ভারতের প্রায় ১০ কোটিরও বেশি পরিবার এই প্রকল্পের মাধ্যমে LPG ব্যবহার করছে। ফলে LPG সরবরাহে সামান্য সমস্যাও দেশের সাধারণ মানুষের উপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতের পতাকা লাগানো একটি LPG ট্যাঙ্কার নিরাপদে Strait of Hormuz পেরিয়ে আসতে পারা স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তির খবর হিসেবে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা Shipping Corporation of India-এর অধীনে পরিচালিত কয়েকটি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করেছে। আন্তর্জাতিক সূত্রে জানা যায়, MT Shivalik এবং MT Nanda Devi নামের দুটি LPG ট্যাঙ্কার এই পথে যাতায়াত করেছে এবং তাতে কয়েক দশ হাজার মেট্রিক টন LPG বোঝাই ছিল। এই জাহাজগুলো ভারতের বিভিন্ন বন্দরে পৌঁছালে সেখান থেকে গ্যাস খালাস করে দেশের বিভিন্ন গ্যাস বিতরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে। বিশেষ করে বড় শহরগুলির পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকাতেও এই গ্যাস পৌঁছে দেওয়া হবে। ফলে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট অনেকটাই কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব উত্তেজনার মাঝেও হরমুজ পেরিয়ে ভারতের LPG জাহাজ ‘শিবালিক’
তবে এই ঘটনা শুধু একটি জাহাজ চলাচলের খবর নয়। এটি ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে বড় একটি প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। কারণ ভারত এখনও পর্যন্ত জ্বালানির ক্ষেত্রে আমদানির উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। বিশেষ করে তেল ও গ্যাসের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশি। বিশ্ব বাজারে রাজনৈতিক বা সামরিক উত্তেজনা বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উপর। এই কারণে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত সরকার কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশের বিভিন্ন রিফাইনারিকে LPG উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলিকে গৃহস্থালির গ্যাস সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বলা হয়েছে। দেশের তিনটি প্রধান তেল বিপণন সংস্থা— Indian Oil Corporation, Bharat Petroleum এবং Hindustan Petroleum—কে বিশেষভাবে এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষের কাছে গ্যাস সরবরাহে কোনও সমস্যা না হয়। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে LPG জাহাজগুলিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নোঙর করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে জাহাজ পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুত গ্যাস খালাস করা যায় এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় দেরি না হয়। অনেক ক্ষেত্রে বন্দরে বিশেষ টার্মিনাল ব্যবস্থাও ব্যবহার করা হচ্ছে যাতে দ্রুত গ্যাস পরিবহন করা সম্ভব হয়। এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল কূটনৈতিক উদ্যোগ। আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিরাপদে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার জন্য ভারত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এছাড়াও ভারতীয় নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে নজরদারি বাড়িয়েছে যাতে ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো নিরাপদে চলাচল করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ভারতের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে গেল। ভবিষ্যতে যদি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়, তাহলে শুধু আমদানির উপর নির্ভর করে দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরি। এর মধ্যে অন্যতম হল দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। যদিও ভারতের নিজস্ব LPG উৎপাদন রয়েছে, তবে তা দেশের মোট চাহিদা পূরণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাই ভবিষ্যতে নতুন গ্যাস ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং উৎপাদন বাড়ানোর দিকে জোর দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি আমেরিকা, আফ্রিকা এবং অন্যান্য অঞ্চল থেকেও LPG আমদানির বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কৌশলগত মজুত বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ তৈরির বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে ভারতের তেলের জন্য কৌশলগত মজুত ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু LPG-এর ক্ষেত্রে সেই ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে সীমিত। ভবিষ্যতে বড় পরিমাণে LPG মজুত করার জন্য আলাদা অবকাঠামো তৈরি করা হলে জরুরি পরিস্থিতিতে তা দেশের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে। সব মিলিয়ে বলা যায়, ভারতের পতাকা লাগানো LPG জাহাজের নিরাপদে হরমুজ প্রণালী পেরিয়ে আসা নিঃসন্দেহে দেশের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর। এই জাহাজগুলোর মাধ্যমে কয়েক হাজার টন রান্নার গ্যাস দেশে পৌঁছাবে, যা দেশের কোটি কোটি পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তবে একই সঙ্গে এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল যে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং কৌশলগত বিষয়। বিশ্ব রাজনীতির উত্তেজনা, সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামা—সবকিছুই জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ভবিষ্যতের কথা মাথায় রেখে ভারতের জ্বালানি নীতি আরও শক্তিশালী ও বহুমুখী করা এখন সময়ের দাবি। যদি সেই পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্তর্জাতিক সঙ্কটের মধ্যেও দেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।