চবাহার বন্দরে ধ্বংসযজ্ঞ ! মার্কিন হামলায় বড় ধাক্কা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram

BEAURO REPORT : পশ্চিম এশিয়ার অশান্ত পরিস্থিতি আরও এক ধাপ জটিল হয়ে উঠেছে। নতুন করে মার্কিন সামরিক হামলায় ইরানের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চবাহার বন্দর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম। এই ঘটনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ চবাহার বন্দর শুধু ইরানের জন্য নয়, ভারতের কাছেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্প। বহু বছর ধরে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে এই বন্দরের উন্নয়নে সহযোগিতা করেছে ভারত। ফলে এই হামলার প্রভাব শুধু ইরান-আমেরিকা সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ভারতের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত স্বার্থের উপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমের দাবি, বৃহস্পতিবার ভোররাত থেকেই চবাহার বন্দর ও তার আশপাশের এলাকায় একের পর এক বিমান হামলা চালানো হয়। বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা। বহু জায়গায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে এবং শহরের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরপর বিস্ফোরণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে। জরুরি পরিষেবার কর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। যদিও হতাহতের সঠিক সংখ্যা এখনও পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা CENTCOM জানিয়েছে, ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও উপকূল প্রতিরক্ষা অবকাঠামো লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছিল ইরানের একাধিক সামরিক ঘাঁটি। সেই কারণেই পরিকল্পিতভাবে ইরানের প্রায় ৯০টি স্থানে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সেনার দাবি, এই অভিযানে শুধুমাত্র সামরিক লক্ষ্যবস্তুকেই নিশানা করা হয়েছে এবং সাধারণ নাগরিকদের অবকাঠামোকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কয়েক মাস আগেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা হওয়ার পর এই প্রথম এত বড় আকারে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর এলাকায় হামলা চালানো হল। এর ঠিক আগের দিনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিকে কার্যত অর্থহীন বলে মন্তব্য করেছিলেন। সেই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শুরু হয় ব্যাপক সামরিক অভিযান। হামলার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, “আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী আঘাত হেনেছি। আমাদের উপর একবার আঘাত এলে তার জবাব আমরা বহু গুণ বেশি শক্তিতে দেব।” ভবিষ্যতে যুদ্ধ আরও বাড়তে পারে কি না, সেই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “এখনই কিছু নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে খুব দ্রুত পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে চলে আসবে।” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, ইরানের সামরিক শক্তি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং তাদের হাতে সীমিত রসদ অবশিষ্ট রয়েছে।

চবাহার বন্দরে ধ্বংসযজ্ঞ ! মার্কিন হামলায় বড় ধাক্কা
ইরান-আমেরিকা সংঘাত তীব্র, চবাহার বন্দরে বিধ্বংসী হামলা ! ভারতের বিনিয়োগ কি জলে গেল ?                                                                                                                                                                                                                          AI IMAGE

অন্যদিকে মার্কিন হামলার পাল্টা জবাবও দিয়েছে ইরান। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্রের দাবি, কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। যদিও সেই হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযানের ফলে গোটা পশ্চিম এশিয়া নতুন করে সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চবাহার বন্দরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব। দীর্ঘদিন ধরেই ভারত এই বন্দরকে নিজেদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল। পাকিস্তানকে এড়িয়ে সরাসরি আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া এবং পশ্চিম এশিয়ার বাজারে পৌঁছনোর জন্য চবাহার ছিল ভারতের অন্যতম কৌশলগত ভরসা। সেই কারণেই বন্দরের আধুনিকীকরণে ভারত বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে। চবাহারের শহীদ বেহেস্তি টার্মিনালের উন্নয়নের জন্য ভারত প্রায় ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। ভারতীয় মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১,১৪৪ কোটি টাকারও বেশি। শুধু তাই নয়, বন্দরের আশপাশে রেলপথ, সড়ক এবং অন্যান্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য আরও প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশেষ ঋণ সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল ভারত। সব মিলিয়ে এই প্রকল্পে ভারতের মোট আর্থিক প্রতিশ্রুতির পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছিল। তবে গত কয়েক বছরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার একাধিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পর ভারতও সতর্ক অবস্থান নিতে শুরু করে। আন্তর্জাতিক চাপের কারণে চবাহার বন্দরের প্রত্যক্ষ পরিচালনা থেকে ধীরে ধীরে সরে আসে ভারত। বর্তমানে বন্দরের পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে ইরানের একটি স্থানীয় সংস্থার হাতে। যদিও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবারও ভারত এই প্রকল্পে সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার ফলে সেই সম্ভাবনা বড় ধাক্কা খেল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ বন্দরের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু বাণিজ্য নয়, আন্তর্জাতিক করিডর নির্মাণের পরিকল্পনাও দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে ভারত-ইরান সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিকেও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চবাহার বন্দর কেবল একটি সমুদ্রবন্দর নয়, বরং এটি দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পশ্চিম এশিয়াকে সংযুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্র। তাই এই বন্দরে হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের উপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বর্তমানে গোটা বিশ্বের নজর পশ্চিম এশিয়ার দিকে। ইরান ও আমেরিকার এই সংঘাত আগামী দিনে আরও কতটা তীব্র হয়, ভারত তার কৌশলগত অবস্থান কীভাবে নির্ধারণ করে এবং চবাহার বন্দরের ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোয়—সেই দিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram