ক্লাবে 'লুকানো' ত্রাণ সামগ্রী, গ্রেফতার পুরপ্রধান !

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram
নবদ্বীপ : বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণসামগ্রী উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া এই ঘটনাকে ঘিরে শনিবার সকাল পর্যন্ত উত্তেজনা বজায় ছিল গোটা এলাকাজুড়ে। সরকারি ত্রাণসামগ্রী মজুতের অভিযোগ, পুলিশি অভিযান, বিক্ষোভ, লাঠিচার্জ এবং শেষ পর্যন্ত পুরপ্রধানের গ্রেপ্তারি— একের পর এক নাটকীয় ঘটনায় সরগরম নবদ্বীপ। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নবদ্বীপের বরালঘাট স্পোর্টিং ক্লাবের একাধিক ঘরে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল পরিমাণ সরকারি ত্রাণসামগ্রী মজুত করে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে সরকারি ত্রাণের ত্রিপল, কম্বল এবং তন্তুজের বিভিন্ন বর্ষের শাড়ি। এলাকার মানুষের দাবি, বহুদিন ধরেই ওই ক্লাব ঘিরে নানা ধরনের গোপন কার্যকলাপ নিয়ে প্রশ্ন উঠছিল। অবশেষে শুক্রবার রাতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর যৌথ অভিযানে সামনে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অভিযোগের ভিত্তিতে শুক্রবার রাত প্রায় সাড়ে ১০টা নাগাদ বরালঘাট স্পোর্টিং ক্লাবে অভিযান চালায় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী। অভিযানে ক্লাবের একাধিক ঘরের তালা খুলে তল্লাশি চালানো হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ক্লাবের প্রায় দশটি ঘর ভর্তি ছিল সরকারি ত্রাণসামগ্রীতে। ঘরের পর ঘর থেকে উদ্ধার হয় ত্রিপল, কম্বল, শাড়িসহ বিভিন্ন সামগ্রী। উদ্ধার হওয়া জিনিসপত্র দেখে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাতের মধ্যেই ঘটনাস্থলে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পাশাপাশি উপস্থিত হন বিজেপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকরাও। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ সরকারি ত্রাণসামগ্রী বছরের পর বছর ধরে গোপনে মজুত করে রাখা হয়েছে। যেসব মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা কিংবা অন্য কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে এই ত্রাণ পাওয়ার কথা ছিল, তাদের কাছে সেই সামগ্রী পৌঁছায়নি বলেই অভিযোগ। বিক্ষোভকারীরা আরও অভিযোগ করেন, বরালঘাট স্পোর্টিং ক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁদের দাবি, নবদ্বীপ পুরসভার চেয়ারম্যান বিমানকৃষ্ণ সাহার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমেই ক্লাবটি পরিচালিত হতো। যদিও এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে এখনও সরকারি ভাবে কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি, তবে ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও বাড়তে থাকে। ক্লাবের সামনে শতাধিক মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাতে থাকেন। উদ্ধার হওয়া ত্রাণসামগ্রীর হিসাব প্রকাশের দাবি তোলেন তাঁরা। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবিও জানানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
ক্লাবে 'লুকানো' ত্রাণ সামগ্রী, গ্রেফতার পুরপ্রধান !
ক্লাবে মজুত সরকারি ত্রাণ ! রাতভর অভিযানে গ্রেপ্তার চেয়ারম্যান

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। সূত্রের খবর, বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ মৃদু লাঠিচার্জ করে। যদিও পুলিশ প্রশাসনের তরফে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনও বিবৃতি এখনও প্রকাশ করা হয়নি। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এরপর রাতভর চলতে থাকে প্রশাসনিক তৎপরতা। তদন্তের স্বার্থে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সামগ্রী খতিয়ে দেখা হয়। ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং কীভাবে সরকারি ত্রাণসামগ্রী সেখানে পৌঁছল, তা জানার চেষ্টা শুরু করেন তদন্তকারীরা। রাত গড়িয়ে ভোরের দিকে আরও নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনা। সূত্রের খবর, শনিবার ভোর প্রায় ৩টা ৪০ মিনিট নাগাদ বিশাল পুলিশ বাহিনী নবদ্বীপ পুরসভার চেয়ারম্যান বিমানকৃষ্ণ সাহার বাসভবনে পৌঁছায়। সেখানে কিছুক্ষণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যেই তাঁকে নবদ্বীপ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিমানকৃষ্ণ সাহাকে নিয়ে যাওয়ার সময় এলাকায় উপস্থিত মানুষের একাংশ তীব্র বিক্ষোভ দেখান। ক্ষুব্ধ জনতার মুখে ওঠে বিভিন্ন স্লোগান। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে যথেষ্ট সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়। যদিও গ্রেপ্তারের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পুলিশ এখনও বিস্তারিত কিছু জানায়নি, তবে তদন্তের স্বার্থেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত পুরপ্রধানকে শনিবার নবদ্বীপ আদালতে তোলা হবে। আদালতে তাঁকে পেশ করে তদন্তের প্রয়োজনে পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানানো হতে পারে বলে সূত্রের খবর। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া ত্রাণসামগ্রীর উৎস, সংরক্ষণের কারণ এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এদিকে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। বিরোধীরা ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে শাসকদলের তরফে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সরকারি ত্রাণসামগ্রী উদ্ধারের এই ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কীভাবে বিপুল পরিমাণ ত্রাণসামগ্রী একটি ক্লাবঘরে বছরের পর বছর মজুত ছিল? কার নির্দেশে তা সেখানে রাখা হয়েছিল? প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে কেন সেই সামগ্রী পৌঁছায়নি? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে তদন্তকারী সংস্থা। গোটা ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে নবদ্বীপ থানার পুলিশ। তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রয়েছে প্রশাসন, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের। আগামী দিনে তদন্তে আর কী কী তথ্য সামনে আসে, সেটাই এখন দেখার।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Telegram