তোলাবাজি মামলার তদন্তে নতুন মোড় ! সব্যসাচী ঘনিষ্ঠদের ঠিকানায় ED অভিযান
কলকাতা : ফের একবার আলোচনার কেন্দ্রে সব্যসাচী দত্ত। শুক্রবার সকাল থেকেই কলকাতা এবং শহরতলির একাধিক এলাকায় তৎপর হয়ে ওঠে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি। তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে খবর, পার্ক স্ট্রিট, শর্ট স্ট্রিট, খিদিরপুর-সহ একাধিক ঠিকানায় একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু হয়েছে। এই সমস্ত ঠিকানার সঙ্গে সব্যসাচী দত্তের ঘনিষ্ঠদের যোগাযোগ রয়েছে বলে তদন্তকারীদের প্রাথমিক দাবি। ভোর থেকেই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকরা নিরাপত্তারক্ষীদের নিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকানাগুলিতে পৌঁছে যান। শুরু হয় দীর্ঘ সময় ধরে নথিপত্র, ডিজিটাল ডিভাইস, আর্থিক লেনদেনের কাগজপত্র এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের কাজ। তদন্তের স্বার্থে একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যকলাপও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। বিশেষভাবে নজরে এসেছে কলকাতার শর্ট স্ট্রিট এলাকার একটি ব্যবসায়ীর বাড়ি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, ওই ব্যবসায়ীর সঙ্গে সব্যসাচী দত্তের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। সেই সূত্র ধরেই শুক্রবার সকালে সেখানে তল্লাশি চালানো হয়। যদিও ওই ব্যবসায়ী বা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এই অভিযানের নেপথ্যে রয়েছে কয়েক মাস আগের একটি বহুল আলোচিত মামলা। গত ৮ জুন, তোলাবাজির অভিযোগে সব্যসাচী দত্তকে গ্রেপ্তার করেছিল বিধাননগর উত্তর থানার পুলিশ। অভিযোগ ছিল, একটি ব্যবসায়িক লেনদেন এবং আর্থিক আদায়কে কেন্দ্র করে বেআইনি প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং পরবর্তীতে সব্যসাচী দত্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে আদালতে পেশ করা হয় এবং মামলার তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যায় রাজ্য পুলিশ। সেই সময় তদন্তকারীরা একাধিক নথি, মোবাইল ফোন এবং ডিজিটাল তথ্যও সংগ্রহ করেছিলেন বলে জানা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। পুলিশি তদন্তে উঠে আসা কিছু আর্থিক তথ্য এবং লেনদেনের সূত্র পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার নজরে আসে বলে সূত্রের খবর।

তদন্তকারীদের সন্দেহ, অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেন, সম্পদের উৎস কিংবা অর্থের গতিপথ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে। সেই কারণেই এই মামলায় অর্থের উৎস, সম্ভাব্য আর্থিক অনিয়ম এবং বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে ইডি তদন্ত শুরু করেছে বলে তদন্তকারী মহলের অনুমান। যদিও ইডি এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযানের পূর্ণ বিবরণ প্রকাশ করেনি। শুক্রবারের এই অভিযানে তদন্তকারীরা বিভিন্ন নথি পরীক্ষা করার পাশাপাশি কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, হার্ড ডিস্ক এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসও পরীক্ষা করছেন বলে সূত্রের খবর। প্রয়োজনে সেগুলি বাজেয়াপ্ত করে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হতে পারে। তদন্তকারীদের মূল লক্ষ্য, অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক লেনদেনের শৃঙ্খল বা ‘মানি ট্রেল’ খুঁজে বের করা। অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে, কোনও ভুয়ো সংস্থা বা বেনামি অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে কি না— সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়াও তদন্তে উঠে আসা একাধিক ব্যক্তির ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। যাঁদের বাড়ি বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চলছে, তাঁদের সঙ্গে সব্যসাচী দত্তের সম্পর্কের প্রকৃতি এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়েও তদন্তকারীরা তথ্য যাচাই করছেন। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই মুহূর্তে ইডির অভিযান চলমান। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব নয়। তদন্তকারী সংস্থা তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং সেই ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অন্যদিকে, আইনের দৃষ্টিতে আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনও অভিযুক্তকে দোষী বলা যায় না। তাই তদন্তের প্রতিটি ধাপেই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। বিরোধী দলগুলি বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছে, অন্যদিকে শাসকদলের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সামনে আসছে। যদিও তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, তারা শুধুমাত্র প্রাপ্ত তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতেই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এবং রাজনৈতিক কোনও বিষয় তাদের তদন্তের অংশ নয়। তদন্তকারী সংস্থার আশা, শুক্রবারের এই তল্লাশি থেকে গুরুত্বপূর্ণ নথি ও তথ্য মিলতে পারে, যা মামলার তদন্তে নতুন দিশা দেখাবে। প্রয়োজনে আরও ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে বলেও সূত্রের খবর। বর্তমানে সকলের নজর ইডির তদন্তের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই তল্লাশি থেকে কী তথ্য উঠে আসে, নতুন করে কারও নাম সামনে আসে কি না এবং তদন্ত কোন দিকে এগোয়— সেটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
